মধ্য আয়ের দেশ হতে লাগবে বাড়তি ৭৫ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ২৮ মে ২০১৫, ০২:৩৭

টানা কয়েক বছর ধরে আরো যা নিশ্চিত করতে হবে

 
প্রবৃদ্ধি লাগবে ৮ শতাংশ
 
রফতানি ও রেমিটেন্স সমানতালে বাড়াতে হবে
 
জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন
 
অর্থনৈতিক সুশাসন, নগর ব্যবস্থার উন্নয়ন
 
মধ্য আয়ের দেশে যাওয়ার লক্ষ্যে এখন বাংলাদেশ। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য পূরণ করার ইচ্ছা সরকারের। সে লক্ষ্যে আর্থিক নীতি গ্রহণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এ স্বল্প সময়ের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে গেলেও তা টেকসই হতে আরো সময় প্রয়োজন। কারণ মাথাপিছু আয়ের হিসেবে নিম্ন-মধ্য আয়ের সারিতে প্রবেশ করলেও অর্থনীতির অন্যান্য অর্জনকে টেকসই করতে হবে।
 
মধ্য আয়ের দেশ নয়, মধ্য আয়ের ক্লাবে ঢুকতে হলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকা বছরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর সঙ্গে লাগবে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন। বর্তমানে কিছু সূচকের অগ্রগতি রয়েছে। অন্যান্য সূচকেরও ধারাবাহিক অগ্রগতি হলে ২০২১ সালে মধ্য আয়ের নিম্ন সারিতে তথা নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ সম্ভব হবে।
 
বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ১ হাজার ৩৫ ডলারের কম হলে নিম্ন আয়ের দেশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের ক্ষেত্রে এই আয় ১ হাজার ৩৬ থেকে ৪ হাজার ৮৫ ডলার। বাংলাদেশে ১৩শ’ ১৪ ডলার। উচ্চ মধ্যবিত্ত আয়ের দেশের ক্ষেত্রে তা ৪ হাজার ৮৬ থেকে ১২ হাজার ৬১৫ ডলার এবং উচ্চ আয়ের দেশের ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় হতে হয় ১২ হাজার ৬১৬ ডলার থেকে তদূর্ধ্ব।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পারিণত হতে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন দরকার। কর্মসংস্থান ও উত্পাদন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সুশাসন, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের সুবিধা যে, বেশকিছু সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে। ১৯৯২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি লোক দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পেরেছে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষাসহ অন্যান্য খাতেও আশাব্যাঞ্জক অগ্রগতি লক্ষণীয়। যদিও এখনো সাড়ে ৪ কোটির বেশি লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে। গত দশক ধরেই গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে বাংলাদেশ। মধ্য আয়ের দেশে যেতে হলে এ হার বাড়াতে হবে এবং ৮ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। আর ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যা   বর্তমানে রয়েছে ২১ শতাংশ। আর জিডিপিতে বিনিয়োগের এ অবদান বাড়াতে হলে প্রতিবছর অন্তত অতিরিক্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। একইভাবে অর্জনগুলোর ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কয়েক বছর ধরে টানা ধরে রাখতে না পারলে তা টেকসই হবে না, তাতে বরং মধ্য আয়ের দেশের ক্লাব থেকে ছিটকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
 
একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। রাজস্ব আহরণ জোরদার করা, অবকাঠামোগত ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে। শ্রমদক্ষতাও বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জন্য একটি অপূর্ব সুযোগ যে, প্রচুর কর্মী রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে পারলে অর্থনীতিতে তার অবদান কয়েক গুণ বেশি হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ত্বরান্বিত করতে পারলে বেসরকারি খাতের কর্মদক্ষতাও আরো বেড়ে যাবে। জনশক্তি ও সেবা খাতের সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে পারে, যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকে এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যায়। গত দশক ধরে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের কারণে বিদ্যুত্, জ্বালানি, পরিবহনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর চাহিদাও বেড়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ঘাটতি দ্রুত দূর করতে হবে।
 

এসব প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে আমরা ইতিমধ্যে মধ্য আয়ের নিম্ন সারিতে চলে এসেছি। তবে আমাদের মধ্য আয়ের উচ্চ সারিতে পৌঁছতে হবে। সেক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতির সূচকগুলোকে শক্তিশালী করা।