দয়া করে সাগরপথে বিদেশ যাবেন না

আপডেট : ২৯ মে ২০১৫, ০০:১১

*থাইল্যান্ডে উদ্ধার হওয়া ৩০ বাংলাদেশির লোমহর্ষক বর্ণনা

 
*আজ করণীয় নির্ধারণে থাইল্যান্ডে বৈঠকে বসছে ১৭ দেশ
 
সিনেমাতেও এতো নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতনের দৃশ্য দেখিনি, কিন্তু বাস্তবে দেখেছি। চোখের সামনে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। টাকার জন্য মানুষ যে এতো ভয়ংকর হতে পারে আগে ভাবিনি। জীবন নিয়ে দেশে ফেরত আসতে পেরেছি-এটাই বড় পাওয়া। মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে এসেছি। ভাই কাউকে এভাবে বিদেশ যেতে দেবেন না। অন্যদের উদ্দেশ্যে বলবো, দয়া করে সাগরপথে বিদেশ যাবেন না, দালালদের খপ্পরে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত। একথাগুলো বলছিলেন, থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০ বাংলাদেশি।
 
এই ৩০ জনের মধ্যে গত বুধবার থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে ১৩ বাংলাদেশিকে। আগামী ১ জুন আরো ১৭ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি ও তাদের স্বজনরা ইত্তেফাক প্রতিনিধির কাছে সাগরপথে বিদেশপাড়ির লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, স্বল্প টাকায় জাহাজে থ্রি ও ফোর স্টার সিটে করে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেয়া হয়। বিদেশ পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কোন টাকা লাগবে না আশ্বস্ত করা হয়। এর আগে সমস্ত খরচ বহন করবে দালালরা। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়ে কঠিন বিপদে পড়েছিলেন তারা। আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছেন তারা।
 
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, ছোট নৌকা থেকে বড় নৌকায় উঠার পর থেকে লোহার রড দিয়ে নির্যাতন করা হতো। খাবার দেয়া হতো না, বরং নৌকায় খাবারের জন্য হাহাকার চলতো। চোখের সামনে জীবন্ত মানুষকে নৌকা থেকে সাগরে ফেলে দেয়া হতো। সমুদ্রে ছোট নৌকা থেকে বড় নৌকায় উঠার পর থেকে থাই পুলিশের হাতে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তারা।
 
‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ সমুদ্রগামী অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য নাগরিক। কিন্তু তাদেরকে মালয়েশিয়ায় না নিয়ে রাখা হতো থাইল্যান্ডের শংখলা জঙ্গলের বন্দিশালায়। এই বন্দিশালায় রেখে মুক্তিপণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত নারকীয় নির্যাতন চালাতেন মানবপাচারে যুক্ত মাফিয়া ও তাদের সহযোগীরা। থাই প্রশাসন হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে।  এর মধ্যে গত এক বছরে থাইল্যান্ডে ১২১৮ জনকে সনাক্ত করেছে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস। এর মধ্যে ৮১২ জন দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার সন্ধ্যা সাতটায় বাংলাদেশ বিমানের ০৮৯ ফ্লাইটে যে ১৩ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে তারা হলেন, কক্সবাজার সদরের নুরুল আলম, মহেশখালীর জাহাঙ্গীর হোসেন, ফজল করীম, রামুর আবু সাঈদ, টেকনাফের সাব্বির আহমেদ, নুরুল আমীন, শফিক, মো. নুরু, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মো. ইয়াকুব, মাগুরা সদরের মোহাম্মদ সানারউদ্দিন, নরসিংদীর শিবপুরের মো. খোকন, বগুড়া সদরের নুর হাসান ও শিবগঞ্জের আতিকুর রহমান। তারা বলেছেন, নিরীহ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে দালালচক্র আমাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলেছিল। এ দালাল চক্রের মূল ঘাঁটি ফকিরাপুল, মতিঝিল ও পল্টন ও গুলিস্তান এলাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেল।
 
১ জুন ফিরবে আরো ১৭ জন
 
আগামী ১ জুন বাংলাদেশ বিমানে দেশে ফিরবেন আরো ১৭ জন। এরা হলেন, নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের জসিমউদ্দিন, কিশোরগঞ্জ বাজিতপুরের রুবেল, মো. রায়হান, সুনামগঞ্জ দুয়ারারবাজারের মো. জোবেল মিয়া, পাবনার সুজানগরের মো. শিপন, যশোরের চৌগাচার মুক্তার, মোশাররফ, টিটু রহমান, আবু মোছা, মুসলিম, উজ্জ্বল হোসেন, সাতক্ষীরার তালার বাবু, ধানদিয়া ইউনিয়নের মো. সবুজ, কুষ্টিয়া মিরপুরের লালমিয়া, নরসিংদীর রায়পুরার মুক্তার হোসেন, শিবপুরের শাহিন ও হবিগঞ্জ বানিয়াচংয়ের আলমগীর।
 
সর্বশেষ গত শুক্রবার ব্যাংককের একটি মসজিদ থেকে চুয়াডাংগার আলমডাংগার বেলগাছি গ্রামের নাজমুল ইসলামকে উদ্ধার করেছে থাই পুুলিশ। ইতিমধ্যে তাকে সেফ সেন্টারে রাখা হয়েছে। গত একমাস আগে নাজমুলকে সাগরপথে দালালরা থাইল্যান্ডে এনেছিল।
 
থাইল্যান্ডে বৈঠকে বসছে ১৭ দেশ
 
মানব পাচার রোধে কী পদক্ষেপ নেয়া যায় সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি দেশ আজ শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বৈঠকে বসছে। এতে মানব পাচারকে মূল ইস্যু হিসেবে আলোচনায় উপস্থাপন করবে থাইল্যান্ড। বৈঠকে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা ছাড়াও আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড ও জাপানও এ বৈঠকে পর্যবেক্ষক পাঠাবে। এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম, জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের (ইউএনওডিসি) প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক গত বুধবার রাতেই থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দলও ওই বৈঠকে অংশ নিবে।
 
হাতিয়ায় সরিয়ে নেয়া হবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প
 
কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরিয়ে বঙ্গোপসাগরের হাতিয়া দ্বীপে নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
 
সরকারের মিয়ানমার শরণার্থী বিষয়ক সেলের প্রধান অতিরিক্ত সচিব অমিত কুমার বল এএফপিকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতিয়া দ্বীপে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারের এ পরিকল্পনা বাতিল করতে অনুরোধ জানিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মোহাম্মদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকারের এমন পদক্ষেপে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।
 
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে দু’টি শরণার্থী ক্যাম্পে ৩২ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন। এসব রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমারের নাগরিক। নিজ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সহিংসতার শিকার হয়ে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে চলে এসেছেন।
 
অমিত কুমার বল বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে কক্সবাজারে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হয়। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে সরকার পর্যটন খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প দু’টিকে দূরের কোনো এলাকায় স্থানান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
 

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক বদরে মুনির ফেরদৌস বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থানান্তরের জন্য হাতিয়া দ্বীপে ৫০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।