নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। ফলে ক্রমেই বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এ পৃথিবী। এ অবস্থায় আগামীতে বিশ্বের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হলো- দ্রারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং গ্রীনহাউজ গ্যাসকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা। আর এ তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ৪টি মহাশক্তি আমাদেরকে সহায়তা করতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে- যুবশক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবসা এবং সার্বজনীন সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সামাজিক ব্যবসা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুনসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশসহ ৩১টি দেশের এক হাজার ৬০০ জনের বেশি প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সামাজিক ব্যবসার প্রবক্তা ড. ইউনূস বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই বেকারত্ব রয়েছে। কিন্তু আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো একজন মানুষও বেকার থাকবে না। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করছে সামাজিক ব্যবসা। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ভুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে উদ্যোক্তা তৈরির কোন ব্যবস্থা নেই। মানুষকে দাস করে রাখা হয়। আমরা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করছি, যা মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হিসেবে লজ্জার। ফলে আমাদের স্লোগান চাকরি প্রার্থী নই, আমরা চাকরি দাতা।
ড. ইউনূস বলেন, আমরা তরুণ বেকারত্বকে ফোকাস করছি। কারণ কোন মানুষ অন্যের চাকরি করার জন্য জন্ম নেয়নি। নিজের অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তি দিয়ে পৃথিবী গঠনে সবাই অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ ধারণা বাদ দিয়ে মানুষকে ভুল পথে চালানো হচ্ছে। সুযোগ পেলে সব মানুষের উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা দেখছি উপর শ্রেণির কিছু মানুষের কাছে সম্পদের পাহাড়। আর নিম্ন শ্রেণির মানুষ সম্পদ শূন্য। ফলে সম্পদশালীদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। আর বৈষম্য থাকলে টেকসই সমাজ হতে পারে না। এ নোবেল বিজয়ী বলেন, চলতি বছরে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ধাপ হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। এর অর্থ হলো সমস্ত বৈষম্য কমিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হবে।
নতুন ধ্যান-ধারণা তৈরির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে ৩০ হাজার বছর সময় লেগেছে। এর পরবর্তী ২০ হাজার বছর পর ১৮০৪ সালে লোকসংখ্যা ১ শ’ কোটিতে উন্নীত হয়। বর্তমানে বিশ্বের লোক সংখ্যা ৭২৫ কোটি। তিনি মনে করেন, বর্তমানে প্রতি ১২ বছরে ১শ’ কোটি লোক বাড়ছে। আর তাদের খাদ্য, পানি এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ আমাদের কাছে জমা নেই। তার মতে, পৃথিবীর সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পুরানো ধ্যান-ধারণা দিয়ে আর চলা যাবে না। এতে দারিদ্র্য আরও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, সামাজিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব হলো গ্রামীণ ব্যাংক। এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের ২০ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে উপকৃত হয়েছে। এদের বেশিরভাগই নারী। ২০০৮ সালে গ্রামীণ আমেরিকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে আমেরিকা শহরেও সমস্যা সমাধানে সামাজিক ব্যবসা দারুণ ফল দিয়েছে। তিনি বলেন, যদিও আমাদের দেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্। নাগরিকদের জীবন ব্যবস্থার মানদণ্ডের গড়ও সর্বোচ্চ। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এখনও অনেক আমেরিকান দরিদ্র জীবনযাপন করে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশ পরিবারের প্রধান নারী। কিন্তু তারা দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। ফলে এ অবস্থা উত্তরণে সামাজিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, গ্রামীণ আমেরিকা বর্তমানে এক লাখ ২৫ হাজার ক্ষুদ্র ঋণ দিয়েছে এবং ৪৭ হাজারের বেশি নারীর কাছে পৌঁছেছে। এ কৌশল নারীদের নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার মূলধন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের সুযোগ দেয় উল্লেখ করে বার্নিকাট বলেন, গ্রামীণ আমেরিকা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি শহরে কাজ করছে এবং ছাব্বিশ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ ৫৭ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে এটার প্রভাব পরিমাপ করা যায়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সামাজিক বাণিজ্য হচ্ছে এমন ধরনের ব্যবসা, যেখানে উদ্যোক্তারা সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করবেন। ব্যক্তিগত লাভ থাকবে না। সামাজিক ব্যবসাকে নিজের আয়েই নিজের যাবতীয় ব্যয় মিটাতে হবে। এ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবসায়ের মুনাফাও পুনঃবিনিয়োগ করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, এ ব্যবসায়ের পুঁজি অমর। এটাই সামাজিক ব্যবসার শক্তি। এ ব্যবসায়ে বিনিয়োগকারীরা শুধু টাকাই নয়, তাদের সৃষ্টিশীলতা, যোগাযোগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত মেধা, জীবনের অভিজ্ঞতাসহ অনেককিছুই বিনিয়োগ করে পৃথিবীটাকে পাল্টে দিতে পারে। সামাজিক ব্যবসার রয়েছে ৭টি মূলনীতি। এর মধ্যে রয়েছে- দারিদ্র্য বিমোচনসহ ব্যক্তিগত মুনাফাহীন কল্যাণকর ব্যবসা, সকলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন, বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবে, এর বাইরে কোনো প্রকার লভ্যাংশ নিতে পারবে না, বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত নেয়ার পর পরবর্তী মুনাফা কোম্পানির সমপ্রসারণে ব্যবহূত হবে, এ ব্যবসা হবে পরিবেশবান্ধব, এখানে চাকরিজীবীরা ভালো পরিবেশ ও চলমান বাজার অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন এবং এটি হবে আনন্দের সঙ্গে ব্যবসা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের নির্বাচিত আট নারী বোর্ড সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দেন। এসময় পরিচালকদের পক্ষে তাহসিনা খাতুন বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর অনেক ঝড় বয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনও সঠিক পথে রয়েছে। সামাজিক ব্যবসা দিবসের এ আয়োজনে দিনব্যাপী মোট ১০টি সেশনে ১০ বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানস্থলে সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তাদের উত্পাদিত পণ্য নিয়ে মেলারও আয়োজন করা হয়।