ঝুঁকি এখনো কাটেনি

আপডেট : ২৯ মে ২০১৫, ২৩:৩৭
পাইলিংয়ের গর্তে ধস
আশপাশের ভবনের গ্যাস-পানি বন্ধ, বাসিন্দারা আতংকে
 
রাজধানীর সার্ক ফোয়ারা মোড়ের পাশে ৬৪ কাঠা জমিতে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের (এনবিএল) নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ারের পাইলিং ধসে গত বুধবার। পরের দিন দুই দফা নির্মাণাধীন ভবনের প্রাচীর এবং সড়কের একাংশ ধসে যায়। তিন দফা ধসের পরও এখনো ঝুঁকি কাটেনি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকি কাটাতে ২ হাজার ট্রাক বালি ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
 
গতকাল বিকালে এক ঘণ্টা বৃষ্টি হয়। এতে মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় ফের ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে আশপাশের এলাকা। আতঙ্কে রয়েছে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে আশপাশের ভবনের পানি ও গ্যাসের লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের পানির চাপ কমাতে ধসে যাওয়া ভবনের পশ্চিম পাশের পাইপে তিনটি বাঁধ দেয়া হয়েছে। এছাড়া চাপ কমাতে পানি পাম্প দিয়ে সেচে অন্যত্র ফেলা হচ্ছে।
 
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হোটেল সুন্দরবন সংলগ্ন নির্মাণাধীন ন্যাশনাল ব্যাংক ভবন এলাকার পুরো অংশই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। গর্তের কারণে ধসের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে  মাটি আলগা হয়ে গেছে। এখন পুরো ভবন এলাকা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশ থেকে সুন্দরবন হোটেলের পূর্বকোণ পর্যন্ত অংশ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান তিনি।  
 
গতকাল সেনাবাহিনীর ছয় সদস্যের একটি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। দুপুরে ঘণ্টাখানেক বালি দিয়ে ভরাট করা বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে পরে সিটি করপোরেশন ও রাজউকের তত্ত্বাবধানে ফের বালি দিয়ে গর্ত ভরাট করার কাজ শুরু হয়। এছাড়া নিরাপত্তার কারণে সুন্দরবন হোটেলের আশপাশ দিয়ে লোকজনের চলাফেরা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে সার্ক ফোয়ারা থেকে হাতিরপুলের দিকের সোনারগাঁও রোড ও সোনারগাঁও রোড থেকে পান্থপথে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ রাখা রয়েছে।
 
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন গতকাল নির্মাণাধীন ভবনের ধসে পড়া অংশ পরিদর্শনে এসে বলেন, সংশ্লিষ্ট কাউকেই একবিন্দু ছাড় দেয়া হবে না। রবিবারের মধ্যেই বন্ধ রাস্তা খুলে দেয়া হবে। তিনি বলেন, ঝুঁকি এড়াতে রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল। এতে বেশ যানজট হচ্ছে। মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা যথাসময়ে রাস্তা খুলতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
 
পাইলিংয়ের পেছনের (পশ্চিম দিক) অংশও যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রকৌশলীরা। পরিদর্শন শেষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ফখরুল আমিন বলেন, ‘সরেজমিনে দেখেছি। পেছন দিকের পাইলিংও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে তা ধসে পড়তে পারে।’
 
?এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি যেন এই জায়াগা নিরাপদে থাকে। ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা উপস্থিত রয়েছেন।
 
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজুর রহমান বলেন, এখন যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে পুরো রাস্তাই ঝুঁকির মুখে আছে। এ জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে পুরো অংশ দেবে যেতে পারে। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন এলাকার আশপাশের স্থাপনা ও রাস্তা ঝুঁকিমুক্ত করতে প্রায় ২ হাজার ট্রাক বালি প্রয়োজন।
 
ধসে যাওয়া স্থানে পর্যাপ্ত বালি ফেলতে পারলে আশপাশের এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের অধ্যাপক ফখরুল আমীন। তিনি বলেন, এখন বালি ফেলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত বালি ফেলতে পারলে নির্মাণাধীন এলাকা ঝুঁকিমুক্ত করা যাবে।
 
বালি ফেলার জন্য দেশের বড় বড় কোম্পানিকে অনুরোধ জানিয়েছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তার অনুরোধে ব্যয়ভার বহনের শর্তে বেশ কয়েকটি কোম্পানি বালি ফেলতে শুরু করেছে।
 
বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলার নির্দেশ
 
উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র সিটি করপোরেশন ও রাজউক কর্মকর্তাদের ধসে পড়া বিলবোর্ডসহ নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশের বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তবে বৃহস্পতিবার সকালেও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে উত্তর পাশের বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন মেয়র। কিন্তু রাত পর্যন্ত সেগুলো সরানো হয়নি। পরে রাত ১০টার দিকে ওই বিলবোর্ডগুলোই ধসে পড়ে।
 
ন্যাশনাল ব্যাংক সহায়তা করছে না
 
ভবন ধসের ঘটনায় ভবনটি ঝুঁকিমুক্ত করার কাজে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ন্যাশনাল ব্যাংকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসেছিলেন। তারপর তাদের আর কেউ ঘটনাস্থলে আসেননি। এ ভবনটি তাদের নিজস্ব সম্পত্তি। তাই এ কাজে তাদের সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকা উচিত। অথচ তারা তেমন কোনো সহযোগিতা করছেন না।
 
ভবনটির কাজের সাব কনট্রাক্ট নেয়া প্রতিষ্ঠান এসএম কন্সট্রাকশন ও মাম ইমপ্যাক্টরের প্রধান মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘ন্যাশনাল ব্যাংক সহযোগিতা করছে, তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। আজ (শুক্রবার) ব্যাংকটির এডিশনাল এমডি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন’।  
 
আশপাশের বাসিন্দারা আতঙ্কে
 
নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ার লাগোয়া বেশ কয়েকটি ভবন রয়েছে। এসব ভবনে অফিস এবং বাসাবাড়ি রয়েছে। আশপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এছাড়া গ্যাস ও পানির লাইন বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছে বাসিন্দারা।
 

পশ্চিম পাশের একটি ভবনের বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ‘পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকি। অফিস করতে হয়। এই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে আছি। কখন বড় দুর্ঘটনা হয় কে জানে! কারও কথায় আশ্ব্বস্ত হতে পারছি না। এছাড়া গ্যাস ও পানির লাইনও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’