নলিয়ানে গিয়ে চোখ মেললেই সুন্দরবন

আপডেট : ২৯ মে ২০১৫, ২৩:৫০

নদী-নালা, গাছ-পালা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর খুলনার দাকোপ উপজেলা। এ উপজেলার গা ঘেঁষে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি সুন্দরবনের অবস্থান। জেলা শহর খুলনা থেকে সড়কপথে মাত্র ঘন্টা দেড়েক এবং দাকোপ উপজেলা সদর চালনা থেকে আধঘন্টার পথ পেরুলেই ছোট্ট নদী বন্দর নলিয়ান। মাঝদিয়ে বয়ে যাওয়া ‘শিবসা’ নদী সুন্দরবন থেকে নলিয়ানকে পৃথক করেছে। এই নলিয়ানে গিয়ে চোখ মেললেই দেখা যায় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। কিন্তু অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে আজও নলিয়ান পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে  উঠতে পারেনি।

 
সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে চালনা ও নলিয়ানে গড়ে উঠতে পারে অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা দ্রুত সুন্দরবনে যেতে পারবেন, তেমনি স্বল্প সময়ে তারা সুন্দরবনের রূপ-লাবণ্য এমনকি কপাল ভালো হলে সুন্দরবনের অহংকার ‘বাঘ-হরিণ’ দেখে ফিরেও যেতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন পর্যটকদের আর্থিক সাশ্রয় হবে, তেমনি দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমনের কারণে সরকারও  বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে। সেইসঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
 
খুলনা মহানগরীর গল্লামারী ব্রিজ থেকে নলিয়ানের দূরত্ব মাত্র ৫৪ কিলোমিটার। ২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগরীর খালিশপুরের জনসভায় খুলনা-দাকোপ-নলিয়ান সড়কটি নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত খুলনা-নলিয়ান সড়কের পূর্ণাঙ্গ কাজ আপাতত হচ্ছে না। ৫৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া গেছে। টেন্ডার শেষে সাতটি প্যাকেজে ৮২ কোটি টাকায় এ নির্মাণ কাজ চলছে। বাকি ২৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়া হলেও নানা জটিলতায় তা আটকে গেছে। সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ করা না হলে  সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্প বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালিশপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনা-দাকোপ-নলিয়ান সড়ক নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসে। মন্ত্রণালয় থেকে সড়কটি দ্রুত নির্মাণ করার জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন হয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) যায়। ২০১২ সালের  ১৩ নভেম্বর ৫২ কোটি  ৭৯ লাখ টাকার এ  প্রকল্পটি  একনেকের বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়। ২০০৮ সালের রেট অনুসারে প্রকল্পটি  তৈরি হওয়ায় অনুমোদনের সময় ২০১১ সালের নতুন রেট রি-কাস্ট করার কথা  হয়।
 
সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) সূত্র জানায়, ইট, পাথর ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৮ সালের রেট অনুযায়ী কাজ শেষ করা দুরূহ হবে। ফলে ২০১১ সালের নতুন রেট রি-কাস্ট করে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানা হয়। নতুন রেট রি-কাস্ট করার পর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৮২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়  রি-কাস্ট প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়।
 
সড়কটির দৈর্ঘ্য ৫৪ কিলোমিটার হলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয় সাড়ে ২৫ কিলোমিটারের। অনুমোদিত সাড়ে ২৫ কিলোমিটার সড়ককে সাত গ্রুপে বিভক্ত করে দরপত্র আহবান করা হয়। ঠিকাদার নির্বাচনের পর কার্যাদেশ দেয়া হয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সওজ সূত্র জানায়, খুলনা থেকে নলিয়ান যেতে ঢাকী ও ঝপঝপিয়া নদীর উপর দু’টি সেতুসহ বাকি সাড়ে ২৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করার জন্য ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় নানা অজুহাত দেখিয়ে প্রকল্পটি বিলম্বিত করছে। নদীপথে খুলনা থেকে নলিয়ান যেতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা। সে কারণে খুলনা-নলিয়ান সড়কের গুরুত্ব অপরিসীম।
 
খুলনা অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক নেতাদের অভিমত: সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশে দাকোপ উপজেলার নলিয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট। এখান থেকে সরাসরি সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। খুলনা-নলিয়ান সড়কটি নির্মিত হলে এই পথে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান ও খুলনা নাগরিক সমাজের চেয়ারপার্সন শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন বলেন, খুলনাসহ বটিয়াঘাটা-দাকোপ উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি: গল্লামারী-নলিয়ান সড়কটি নির্মাণ। এই সড়কটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার এবং সুন্দরবন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি সড়কটি ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টিসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তারা এ সড়কটি দ্রুত নির্মাণের দাবি জানান।
 

এ ব্যাপারে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত এ সড়কটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে দাকোপ-বটিয়াঘাটা উপজেলায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠাসহ এ অঞ্চলে উন্নয়নের দিগন্ত সূচিত হবে।