কি পাসের হার, কি জিপিএ ৫—দুটোয়ই এবার ছন্দপতন। গত ছয় বছরের পাসের হার বৃদ্ধির ধারাবাহিতায় এবারই পরিবর্তন হয়েছে। পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর সংখ্যা কমেছে। এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০ বোর্ডে পাসের হার ৮৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। গতবছর এ হার ছিল ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৩ সালে ছিল ৮৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এবার জিপিএ-৫-এর সংখ্যাও গতবারের চেয়ে কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০১ জন, গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ ।
পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই দায়ী করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন—বিএনপি-জামায়াত জোটের হরতাল অবরোধের কারণে শিক্ষার্থীরা যেমন সঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি, তেমনি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। তবে ১০ শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে থেকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের পাসের হার বেড়েছে। গতবছর মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ, এবার ৯০ দশমিক ২০ শতাংশ। এবার কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, গতবছর ছিল ৮১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের পঞ্চদশ বছরে এবার সেরা দশের তালিকায়ও নতুন নতুন নাম উঠে এসেছে। বাদ পড়েছে অনেক পুরনো প্রতিষ্ঠান। এবারই প্রথম হয়েছে ডেমরার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শনিবার বেলা ১টায় সচিবালয়ে তার সম্মেলন কক্ষে এসএসসির ফল ঘোষণা করেন। এর আগে সকাল ১০টায় তিনি গণভবনে পরীক্ষার ফলাফলের কপি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
গত ছয় বছরের পাসের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—প্রতিবছর পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে। এবারই এর ছন্দপতন হলো। ২০০৯ সালের পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে হয় ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এরপর ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৩ হাজার ৬৩১ জন।
প্রতিবারের মতো এবারো শহরের স্কুলগুলোর ভালো ও ঈর্ষণীয় ফল অব্যাহত রয়েছে। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভালো ফল করা স্কুলগুলোতে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। স্কুলে স্কুলে বাদ্য বাজিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে, হাতে হাত রেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কাঙ্ক্ষিত ফলের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপেক্ষা করতে থাকে। বেলা ২টায় স্কুলের দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়া হয় ফল। এর পরই অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফল জানার জন্য। কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পেরে অনেকের চোখেই আনন্দ অশ্রু দেখা যায়। আবার প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে না পেরে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বেলা ২টা থেকে ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া, মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমেও পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল জানতে পারে।
এসএসসি পরীক্ষার ফলে পাসের হারে গত বছরের মতো এবারও শীর্ষে অবস্থান করছে রাজশাহী বোর্ড। অপর দিকে, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে সেরা ঢাকা বোর্ড। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৯৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ বোর্ডে গত বছর পাসের হার ছিল ৯৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ৮১ দশমিক ৮২ ভাগ পাসের হার নিয়ে সবার নিচে অবস্থান করছে সিলেট বোর্ড। আট বোর্ডের মধ্যে এবার ঢাকায় পাসের হার ৮৮ দশমিক ৬৫, কুমিল্লায় ৮৪ দশমিক ২২, যশোর বোর্ডে ৮৪ দশমিক ০২, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৮২ দশমিক ৭৭, বরিশালে ৮৪ দশমিক ৩৭ ও দিনাজপুরে ৮৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া, মাদ্রাসা বোর্ডে দাখিলের পাসের হার ৯০ দশমিক ২০ শতাংশ, কারিগরী শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক ০১ শতাংশ।
এ বছর ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯৪ জন। পাস করে ১২ লাখ ৮২ হাজার ৬১৮ জন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৪ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৪ জন ছাত্রী। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১১ লাখ ৮ হাজার ৬৮৩ জন। এর মধ্যে পাস করে ৯ লাখ ৬১ হাজার ৪০৫ জন।
এবারো পাঁচটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে সেরা স্কুল নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবারের মতো এবারো প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে ২০টি সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় সব বোর্ডের মধ্যে সেরা হয়েছে ডেমরার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দ্বিতীয় রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
এবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৯৫টি। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ২১০টি। এবং শূন্য ভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৪৭টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৪।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড:
এবার ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লাখ ১০ হাজার ৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩০৬ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪০ জন ছাত্রী।
রাজশাহী বোর্ড:
এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৫২০ জন। উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ২১ হাজার ১০৮ জন। এর মধ্যে ৬৩ হাজার ২৬১ জন ছাত্র এবং ৫৭ হাজার ৮৪৭ জন ছাত্রী।
কুমিল্লা বোর্ড:
কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৫ জন। এর মধ্যে ৫৭ হাজার ৯৩৫ জন ছাত্র এবং ৬৪ হাজার ৮৩০ জন ছাত্রী।
যশোর বোর্ড:
যশোর বোর্ডে ১ লাখ ২৮ হাজার ১৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৯৮ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৯ জন ছাত্র এবং ৫২ হাজার ৬৮৯ জন ছাত্রী।
চট্টগ্রাম বোর্ড:
এ বোর্ডে ৮৮ হাজার ৪৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৩ হাজার ২২১ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ৪৫৫ জন ছাত্র এবং ৩৭ হাজার ৭৬৬ জন ছাত্রী।
বরিশাল বোর্ড:
এ বোর্ডে ৭০ হাজার ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৯ হাজার ৪৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৫৫৭ জন ছাত্র এবং ২৯ হাজার ৮৮৯ জন ছাত্রী।
সিলেট বোর্ড:
এ বোর্ডে ৭০ হাজার ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৮ হাজার ৯৩২ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৯৬৬ জন ছাত্র এবং ৩১ হাজার ৯৬৬ জন ছাত্রী।
দিনাজপুর বোর্ড:
এ বোর্ডে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৩২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ১৮৯ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৪৪৬ জন ছাত্র এবং ৫২ হাজার ৭৪৩ জন ছাত্রী।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড:
এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬২২ জন পরীক্ষার্থী। মোট উত্তীর্ণ হয় ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৬ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ৯২৪ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৮ হাজার ৭৪২ জন ছাত্রী।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড:
এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ১০ হাজার ২৮৯ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৯১ হাজার ৫৪৭ জন উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৯০৫ জন ছাত্র এবং ২৪ হাজার ৬৪২ জন ছাত্রী।
