বাংলাদেশি পরিচয় বহন করেও এত দিন ভোটারাধিকারের সুযোগ পাননি। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকাতেই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিচয়পত্রও ভাগ্যে জুটেনি। জাতীয় পরিচয়পত্রধারী না হলে পাসপোর্টও মেলে না। তবে এবার আর নামে বাংলাদেশি নয়, সত্যিকারের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে যাচ্ছেন ভারতের ভূ-খণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশের ছিটমহল বাসিন্দারা। অচিরেই ছিটমহলের বাসিন্দাদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি জুন মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম ছিটমহলবাসীরা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত্ ভোটার তালিকা নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি ভারতের ভূ-খণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশের ছিটমহলবাসী। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ৪০ হাজার ছিটমহলবাসীর নাম ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর যতবারই ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছে ততবারই আইনি জটিলতার কারণে তাদেরকে ভোটার করা হয়নি।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল রাজ্যসভা ও লোকসভায় পাস হয়েছে। ৬ থেকে ৭ জুন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের পর সহসায় ছিটমহলের অধিবাসীরা ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে—ছিটমহলে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকায় সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ছিটমহলবাসীকে ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছিল। ওই সময়ে ৩৩টি ছিটমহলের বাসিন্দাকে ভোটার তালিকার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তার মধ্যে কুড়িগ্রামের ১৮টি, পঞ্চগড়ের ১১টি এবং লালমনিরহাটের ৪ টি ছিটমহল ছিল। এসব ছিটমহলের ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। এরপর যতবারই ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছে ততবারই ছিটমহলবাসীকে ভোটার করার ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকায় এ ছিটমহলে প্রবেশের কোন বাধা না থাকায় তাদেরকে হালনাগাদ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে ছিটমহলবাসীকে ভোটার করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১২ সালের ১০ মার্চ ভোটার তালিকার হালনাগাদ কার্যক্রমে ছিটমহলবাসী অর্ন্তভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল ইসি। এর অংশ হিসেবে এপ্রিল মাসে ছিটমহল গুলোয় প্রবেশে ভারত সরকারের অনুমতি জন্য পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেয় কমিশন। এ ছাড়া, কমিশন থেকে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তত্কালীন কমিশনের চিঠির জবাবে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়—ছিটমহলের বিনিময় বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ছিটমহল বিনিময় নিষ্পত্তি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ঠ এলাকার ভোটারদের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা যাবে। ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেসময়ে সংশ্লিষ্ঠ এলাকার বাসিন্দারা ভোটার হতে পারেনি।
ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে ভোটার করতে লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামের জেলার নির্বাচন কর্মকর্তারা নিজ নিজ জেলার অধীন বাংলাদেশের ছিটমহলের তালিকা কমিশনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এসব ছিটমহলের জনসংখ্যার হিসাব তারা সরবরাহ করতে পারেননি। এরপর কমিশন থেকে ২০১২ সালে ৫৭টি ছিটমহলে প্রবেশের অনুমোদনের জন্য সরকারের অনুমতি চাওয়া হয়। তার মধ্যে লালমনিরহাটের ২৮টি, কুড়িগ্রামে ১৮টি এবং পঞ্চগড়ে ১১টি ছিটমহল ছিল। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৫ মে শুরু হওয়ায় ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমেও তাদের ভোটার করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে এবার ছিটমহলবাসীসহ যারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি তাদেরকে ভোটার তালিকায় যুক্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিউদ্দীন আহমদের কাছে নোটিস পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন—ছিটমহলবাসীর ভোটার করার ব্যাপারে কমিশন ইতিবাচক। দ্রুত ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করা হবে। দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেই সামনের হালনাগাদ কার্যক্রমের আওতায় ছিটমহলের অধিবাসীদের ভোটার করা হবে।
