‘ঢাকায় নতুন অধ্যায় শুরুর লক্ষ্য মোদির’

আপডেট : ৩১ মে ২০১৫, ১৯:৫৭
 
 
আগামী ৬ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সফরে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চান তিনি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শান্তি এবং স্থায়িত্ব নিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি। ভারতের আনন্দবাজারকে তিনি এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি।
 
রবিবার পত্রিকাটিতে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হতে চলেছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন—সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে সংসদের অনুমোদন নিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তিটি করতে চলেছে ভারত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে এই সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পরও সেই বিতর্ক বহাল ছিল। আমরা এই বিতর্কের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছি এবং সেটা সর্বসম্মতির ভিত্তিতে। এটি কোনো সামান্য ঘটনা নয়। সীমান্ত নিয়ে বিরোধ মিটলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব আরো মজবুত হবে বলে মনে করেন মোদি।
 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও এ দিন প্রধানমন্ত্রীর সুরেই বলেন—নেহ্রু প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৪৭-এ। তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় ৬৮ বছর। এত দিন পরে দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা সমাধানের একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এটা দারুণ ব্যাপার!
 
শনিবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এগুলো মূলত—বন্দর, জলপথে বাণিজ্য, মানবপাচার-বিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে। এই সফরকে এতটা গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের মোদি বলেন—আয়তনে বাংলাদেশ ছোট হলেও আমাদের কাছে তার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক।
 
শেখ হাসিনার সরকার বেশ কয়েক বছর ধরেই সন্ত্রাস দমনে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি মনে করেন—উন্নয়নই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করার কাজে সব চেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে। দুই দেশের যোগাযোগ যত বাড়বে, পারস্পরিক আস্থাও তত বাড়বে। এই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতেই একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেবে দিল্লি। আর যোগাযোগ বাড়াতে কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে আগরতলা পর্যন্ত চালু হচ্ছে নতুন বাসরুট। এ ছাড়া, এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা সরকারের সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে।
 
শনিবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে জাহাজ পরিবহন-বিষয়ক একটি চুক্তির খসড়া অনুমোদন পায়। এই চুক্তি অনুসারে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের পথ আরো সুগম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় যেখানে যেখানে চেকপোস্ট আছে, ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন আছে, সেখানে দ্রুত সড়ক তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে।
 
প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্র বলছে—দক্ষিণ এশিয়ায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশই ভারতের সব চেয়ে বড় বাণিজ্য-সহযোগী। ফলে এই চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। মানবপাচার-বিরোধী এক বিশেষ সমঝোতা স্মারকের খসড়াতেও অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অপরাধ দমনের পাশাপাশি এই বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায়শই লেগে থাকা গোলযোগ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
 
স্থলসীমা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ছবিটি ঢাকায় সামনে তুলে ধরতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকেও সফরসঙ্গী হতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদি। মমতা ৫ জুন রাতেই কলকাতা থেকে ঢাকা পৌঁছাচ্ছেন। ৬ জুন ফিরবেন কলকাতায়। আর নরেন্দ্র মোদি ফিরবেন এক দিন পর ৭ জুন।
 
প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্রে বলা হচ্ছে—দুই দেশের মধ্যে স্থলসীমান্তের সব চেয়ে বড় অংশটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এ কারণে মোদির এই সফরে মমতার সঙ্গী হওয়াটা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ।
 
কূটনৈতিক সূত্রের খবর—মোদির সঙ্গে হাসিনার বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি তোলা হবেই। তবে প্রকাশ্যে তিস্তা নিয়ে মোদি কোনো কথা বলবেন না বলেই ঠিক হয়েছে। এমনকি কোনো যৌথ বিবৃতিতেও তিস্তার উল্লেখ থাকবে না। কিন্তু গঙ্গা এবং তিস্তা ছাড়া আরো যে ৫২টি নদীর পানি বণ্টন ঘিরে দুই দেশের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, তার সবই খতিয়ে দেখার একটা আশ্বাস ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া হতে পারে। এই বিষয়গুলিকে যৌথ নদী কমিশনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টাও হতে পারে। তবে তিস্তা জট খুলতে প্রধানমন্ত্রীর তরফে উদ্যোগ যে নেয়া হবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
 
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে তিস্তা নিয়ে যে সমাধানসূত্রটি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল—শুকনো মৌসুমে তিস্তায় যে পরিমাণ পানি থাকবে, তা সমান ভাগে ভাগাভাগি হবে দুই দেশে। যার মধ্যে আবার প্রত্যেক দেশ থেকেই চার ভাগ পানি বরাদ্দ করা হবে নদীখাতে নাব্য বজায় রাখতে চার্জিংয়ের জন্য। কিন্তু মমতা এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তার যুক্তি—শুকনো মৌসুমে তিস্তায় কার্যত পানিই থাকে না। আর বর্ষার সময় বাংলাদেশ পানি পায় প্রকৃতির নিয়মেই। তাই সমস্যা মূলত শুকনো মৌসুমে।
 
এ দিকে, সিকিম তিস্তায় প্রায় ৮টি হাইড্রোলিক বাঁধ তৈরি করেছে। এ নিয়েও মমতার আপত্তি রয়েছে। সিকিমের বক্তব্য—তারা পানি আটকে বাঁধ দেয়নি। তবে মমতার দাবি সিকিমের এই বক্তব্য যাচাই করার দায়িত্ব পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের।
 
সূত্রের খবর—তিস্তা চুক্তি সম্ভব হলে ওই নদী সংস্কার এবং পানি সরবরাহের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ পাওয়া যাবে। ফলে এখন তিস্তা প্রকল্পে ভারতের যে ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে পানি যায়, ভবিষ্যতে তা ৯ লাখ হেক্টর জমিতে সরবরাহ করা যেতে পারে। কিন্তু কেন্দ্র-রাজ্যের এই বিতর্ক এখনো মেটেনি। ফলে হাসিনা সরকারের থেকে মোদিকে আরো সময় নিতে হবে।
 
তবে মোদির বাংলাদেশ সফরে মমতার সঙ্গে থাকাটা অনেক দিক থেকেই তাত্পর্যপূর্ণ বলে দাবি করছেন কূটনীতিকদের একাংশ। মমতা নিজেই কিছু দিন আগে বাংলাদেশ সফর করে এসেছেন। জট না খুললেও তিস্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাই নরেন্দ্র মোদির পক্ষেও এই বার্তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে যে, তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত করার ব্যাপারে মনমোহন সিং যা পারেননি, তিনি সেটা করতে পারছেন। অর্থাত্, মমতাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানে এগোচ্ছেন। সফরে এটিও সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারবেন মোদি।