নির্ভীক সাংবাদিক মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট : ৩১ মে ২০১৫, ২৩:৩৩

গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৬৯ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক।

 
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জগতে মানিক মিয়া এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) তাঁর হাত ধরেই সাংবাদিকতা এক নতুন মোড় নিয়েছিল। তথাকথিত নিরপেক্ষতা নাকি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টিই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য– এই বাস্তবতায় তিনি তথাকথিত নিরপেক্ষতার বদলে মানুষের মুক্তির পক্ষেই নিজেকে, সাংবাদিকতাকে নিয়োজিত করেছিলেন। কোন মতবাদ প্রচারণা নয় সাংবাদিকতার একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য যে গণমানুষের মুক্তির জন্য নিয়োজিত থাকা, ন্যায়ের প্রশ্নে অবিচল থাকা– এই কথা তিনি সারাজীবনের কাজ দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
 
দৈনিক ইত্তেফাকের অঙ্গসজ্জায় আজ আমূল পরিবর্তন এসেছে, হয়ে উঠেছে আধুনিক। সাধু ভাষার বদলে চলিত ভাষাকে গ্রহণ করা হয়েছে সময়ের দাবি মেটাতে। কিন্তু সম্পাদকীয় নীতি আজো মানিক মিয়ার প্রদর্শিত পথেই পরিচালিত হচ্ছে। গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর থেকে একই রয়েছে।
 
নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে মানিক মিয়া কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, প্রবাদপ্রতিম এই ব্যক্তিত্ব দেশের সাংবাদিকতাকে একটানে বদলে দিয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর।
 
শুধু সাংবাদিক কিংবা রাজনীতির পথ প্রদর্শকই নন, মানুষ হিসাবেই তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার সংস্পর্শে যিনি একবার এসেছেন তিনি তাঁর সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তেমনি তাঁর সহানুভূতিশীল হূদয় ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আজো মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।
 
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার মানিক ভাই’ শিরোনামে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, ‘... আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই’র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। ১৯৪৩ সাল থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দু’ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি। ... একটা বিষয়ে আমরা উভয়ই একমত ছিলাম এবং তা হল, বাংলার  স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ভিন্ন বাঙালির মুক্তি নেই, এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না। আর ছিল না বলেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও দু’জন দু’ফ্রন্টে থেকে কাজ করেছি। আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে আর মানিক ভাই তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে।’
 
তিনি যেমন বাংলা সাংবাদিকতা জগতে পথ প্রদর্শক, তেমনই রাজনীতিতেও। রাজনৈতিক জগতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য। ঘনিষ্ঠ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল মানিক মিয়ার।
 
মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক ছিলেন না। বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বারবার তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর বারবার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেফাক এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন। একসময়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে সরকারের সঙ্গে আপস করলে তিনি ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণী জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তাঁর সঙ্গে আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
 
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী
 
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মুসলেমউদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভাণ্ডারিয়া হাইস্কুলে। ভাণ্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারি হাইস্কুলে। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কন্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
 
এসময় তিনি তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহ্?রাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আহ্বানে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগ দেন তদানীন্তন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার সংযোগ অফিসার হিসেবে। কিছুদিন পর সে চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পরিষদেও সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। এ পত্রিকার সাথে মানিক মিয়া মাত্র দেড় বছর যুক্ত ছিলেন। ’৪৭-এর দেশবিভাগের পর কিছুকাল কলকাতায় অবস্থান করে মানিক মিয়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে জন্ম নেয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের। ১৯৫১ সাল থেকে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি একবছর জেল খাটেন। ১৯৬৬ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
 
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি
 
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে আজ সোমবার সকাল সাতটা থেকে মরহুমের আজিমপুর কবরস্থানের মাজারে কোরআনখানি ও বেলা ১০টায় মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া কাজলারপাড়ের ইত্তেফাক অফিসের বাইতুল জান্নাত মসজিদে বাদ জোহর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
 
এদিকে, মরহুম মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে এতিমখানায় তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠ কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার (বেবী) এর বাসভবনে বাদ এশা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর ১ আর কে মিশন রোডে বিকাল চারটায় মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন কার্যালয় উদ্বোধন করা হবে।
 
জাতীয় পার্টি-জেপি’র কর্মসূচি
 
নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী যথযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি-জেপি’র পক্ষ থেকে আজ সোমবার সকাল সাড়ে আটটায় আজিমপুরে মরহুমের মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে মাজারে অনুষ্ঠিতব্য মিলাদ মাহফিলে যোগদান করা হবে। জেপি’র মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম দলের সকল শাখাকে যথাযথ মর্যাদার সাথে মরহুমের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। পরে বিকাল ৩টায় কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মাল্টিপারপাস হলে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বিশেষ অতিথি থাকবেন স্ব্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক .ম মোজাম্মেল হক,  নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান প্রমুখ।
 

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সংবাদপত্র জগতের পথিকৃত্, দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ সংগঠন কার্যালয়ে আজ সোমবার বিকাল ৪টায় স্বাধীন সংবাদপত্র পাঠক সমিতির উদ্যোগে ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও আজকের সংবাদপত্র’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও গবেষক মুহাম্মদ আশরাফ খান। মুখ্য আলোচক থাকবেন চট্টগ্রাম সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত। সভাপতিত্ব করবেন স্বাধীন সংবাদপত্র পাঠক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি সাংবাদিক এসএম জামালউদ্দিন। আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনীতিক, আইনজীবী নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করবেন। অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য স্বাধীন সংবাদপত্র পাঠক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন অনুরোধ জানিয়েছেন।