ফল মাছে ফরমালিন মাপার যন্ত্র নেই

আপডেট : ০১ জুন ২০১৫, ০০:২৩

দেশে ফরমালিন মাপার কোন যন্ত্র নেই। ফলে বাজারে যেসব ফল বিক্রি হচ্ছে তা ভেজালমুক্ত কিনা তা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ইতপূর্বে ফরমালডিহাইড মিটার-৩০০ দিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করা হতো। কিন্তু এটি ফল বা খাদ্যদ্রব্যে মেশানো ফরমালিন পরীক্ষার জন্য তৈরি হয়নি।

 

হাইকোর্টের নির্দেশে সরকারি তিনটি সংস্থা আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ যন্ত্র দিয়ে খাদ্যদ্রব্যে ও ফলে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায় না। এটি শুধু বাতাসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল (রাসায়নিক) আছে কিনা তাই পরীক্ষা করা যায়। এ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত বছরের নভেম্বরে এক মাসের মধ্যে সঠিক যন্ত্র সংগ্রহের জন্য খাদ্য, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু গত ৬ মাসেও সঠিক যন্ত্র আমদানি করা সম্ভব হয়নি।

 

তবে গত ২০ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটি গত ২৮ মে তাদের প্রথম বৈঠক করেছে। তবে কি ধরনের ফরমালিন মাপার যন্ত্র সংগ্রহ করা হবে এ বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ফরমালিন পরিমাপের যন্ত্র না থাকায় এবার বাজারে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে গত বছরের সাঁড়াশি অভিযানের ফলে মৌসুমি ফলের উত্পাদক বিশেষ করে আম, লিচুর বাগান মালিক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।

 
উচ্চ আদালতে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির গত বছর দেয়া পৃথক পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০ নামক যন্ত্রটি ফল, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের জন্য তৈরি করা হয়নি। তবে এটি বাতাসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল (রাসায়নিক) আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারে।’ হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দাখিল এবং সঠিক যন্ত্র সংগ্রহের নির্দেশনার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ফল ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল বা ফরমালিনের উপস্থিতি পরিমাপের বিষয়ে কোন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। সাধারণত প্রতিবছর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসন বাজারে অভিযান পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু ফরমালডিহাইড মিটার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেয়ার পর এবছর অভিযান পুরোপুরিই বন্ধ রয়েছে। কারণ সরকারের তিনটি সংস্থার পরীক্ষায় ওই যন্ত্রটি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য পড়েছে হুমকির মুখে।
 
ফল বা খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিত হতে বাজারে অভিযান পরিচালনা করত ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যে কোন বাজারে এ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করত স্থানীয় প্রশাসন। ফল বা খাদ্যদ্রব্যে যদি ফরমালিন পাওয়া যেত তাহলে ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদানের পাশাপাশি ধ্বংস করা হত ওইসব খাদ্যদ্রব্য বা ফলমূল। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট পরীক্ষণ যন্ত্রের অভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে বিসিএসআইআর ও বিএসটিআই রাসায়নিক পদ্ধতিতে ফরমালিন পরীক্ষা করছে। তা শুধু ল্যাব পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিসিএসআইআর মাছ, মাংস ও দুধে ফরমালিন পরীক্ষায় কিট সরবরাহ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নিলুফার বেগম বলেন, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করলে খাদ্য দ্রব্যের ফরমালিন উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে ফরমালডিহাইড মিটারটি ফরমালিন সনাক্তকরণের অনুপযোগী।
 
গত বছর আমের মৌসুমে ঢাকার বেশ কয়েকটি প্রবেশ পথে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই আদালত ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০ নামক যন্ত্র ব্যবহার করে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত হাজার হাজার মণ আম ধ্বংস করে। এরপরেই ওই যন্ত্র দিয়ে ফরমালিনের উপস্থিতি সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না দাবি করে হাইকোর্টে রিট করেন ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাধন চন্দ্র দাশ ও সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম। ওই রিটের শুনানি শেষে গত ২১ জুলাই বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ যন্ত্রটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বিসিএসআইআর, বিএসটিআই এর মহাপরিচালক এবং ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরিচালককে নির্দেশ দেয়।
 
ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর বিসিএসআইআর, বিএসটিআই ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি পরীক্ষণ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। বিসিএসআইআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল সেন্সর নামের এক কোম্পানির তৈরি করা ‘জেড ৩০০’ মডেলের ‘ফরমালডিহাইড ভ্যাপর মিটার’ যন্ত্রটি পরিবেশ ও বাতাসে ফরমালডিহাইডের বাষ্প মাপার ‘সংবেদনশীল’ যন্ত্র। এর মাধ্যমে বাতাসে ফরমালডিহাইড গ্যাসের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। এই যন্ত্র ব্যবহার করে খাদ্যে ফরমালডিহাইডের পরিমাণ জানার কোনো ‘অ্যাপ্লিকেশন নোট’ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দেয়নি। তবে এই যন্ত্র ব্যবহার করে খাদ্যের ফরমালডিহাইড পরিমাপ করতে হলে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ্লিকেশন ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে যন্ত্রটির উন্নয়ন ঘটিয়ে ফুড অ্যাপ্লিকেশন নোট সরবরাহ করা প্রয়োজন। এতে আরো বলা হয়, এ মেশিনটি বাতাসে কোন ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু ফলে বা খাদ্যে মেশানো ক্ষতিকর দ্রব্য পরীক্ষার জন্য এটা তৈরি করা হয়নি। বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও ফলে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে মাপা যায় না। সাতটি মৌসুমি ফলের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দেয়। সরকারি সংস্থাগুলোর এই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত বছরের ২৪ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দেয়। ওই কমিটিতে বিসিএসআইআর, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপককে রাখা হয়। এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে সঠিক যন্ত্র সংগ্রহের নির্দেশ দেয়। আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে খাদ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য সচিব গত ২০ মে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালককে সভাপতি করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেন। ওই কমিটি বৃহস্পতিবার তাদের প্রথম বৈঠক করেছে। কমিটি অনুসন্ধান করে দেখবে ফরমালিন পরীক্ষার জন্য সঠিক যন্ত্র রয়েছে কিনা? যদি তা পাওয়া যায় তাহলে কমিটি প্রতিবেদন দিয়ে বিষয়টি হাইকোর্টকে অবহিত করবেন।
 
খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মো. জহুরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, সঠিক যন্ত্র না থাকলেও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিসিএসআইআরএ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটি বাজারে নয়, ল্যাব পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
 

মনজিল মোরসেদ বলেন, ফরমালিন পরীক্ষার জন্য সঠিক যন্ত্র সংগ্রহের নির্দেশ দিলেও সেই আদেশ এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। সঠিক যন্ত্র না থাকার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফা লাভের আশায় ফল ও খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহার করতে পারে। তিনি বলেন, গত বছরেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঘন ঘন অভিযানের ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিলো যে, ফলে ফরমালিনের ব্যবহার করা যাবে না। এবার সেই ধরনের অভিযানও চোখে পড়ছে না।