অর্থনৈতিক অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল: সিপিডি

আপডেট : ০১ জুন ২০১৫, ২০:০৩
 
 
গণতান্ত্রিক অস্বস্তি থাকলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সন্তোষজনক পর্যায়ে ছিল বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
 
সংগঠনটির মতে, বর্তমানে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা রয়েছে। অবশ্য বেশ কিছু জায়গায় স্বস্তির দিকও রয়েছে। এ স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সংস্কার উদ্যোগে বড় ধাক্কা দিতে হবে। এটি করতে পারলে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে বাংলাদেশ। অবশ্য সংস্কারের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের মতামত এবং সর্বোপরি নাগরিক ঐক্যের দরকার বলে সংগঠনটি মত দিয়েছে।
 
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৪-১৫: তৃতীয় অন্তর্বতীকালীন পর্যালোচনা’ নামে প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এমন মতামত দিয়েছে সিপিডি। এতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থার গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।
 
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নর উত্তর দেন। এ সময় সিপিডির সংলাপ ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ, ঊর্ধ্বতন গবেষণা সহযোগী মো. জাফর সাদিকসহ সংস্থার অন্যান্য গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
 
অনুষ্ঠানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্ত সেই পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত যেটুকু গতি ও উদ্যম লক্ষ্য করা গেছে, কেন জানি এখন তা নেই। তিনি বলেন, আর্থিক পরিকল্পনার গুণগত মানের ক্ষয় হয়েছে। অর্থাৎপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি বাড়ছে। আবার বড় ধরনের সংস্কারেও সরকার ঢোকেনি। এর বড় উদাহরণ পিপিপি ও বেসরকারিকরণ পরিস্থিতি।
 
 
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে, ২৭টি স্থল বন্দরের অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। এর সঙ্গে যোগায়োগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। সর্বোপরি ভারতের সঙ্গে বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনার জন্য  দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। যার অভাব সরকারের রয়েছে।
 
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অপ্রদর্শিত আয়কে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য কর আইন সংশোধনসহ নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে বেনামি সম্পত্তি গড়ার প্রবণতা বন্ধ করতেও আইনের প্রয়োজনীয়তা  রয়েছে।
 
কর বিষয়ে তিনি বলেন, চিরাচরিত নিয়মে কর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে করদাতাদের জীবনে শুধু ভোগান্তিই বাড়বে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
 
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এবছরই ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ওই পরিকল্পনায় চলতি অর্থবছরে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেদিক থেকে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। আগামী বাজেট হবে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বাজেট। তাই তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগের মাত্রা ও উত্কর্ষতা বাড়াতে হবে বলে তিনি মত দিয়েছে।
 
মূল প্রতিবেদনে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলেও এ বছর অর্থনীতির বেশ কিছু সূচক ইতিবাচক ছিল। ইতিবাচক দিকের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, রেমিট্যান্স প্রবাহ যথার্থ ছিল, সুদের হার কিছুটা কমেছিল, আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মাথাপিছু আয় কিছুটা বেড়েছিল। এসব সম্ভাবনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজস্ব আহরণ করতে না পারা, বৈদেশিক সম্পদের ব্যবহার করতে না পারা, রফতানি প্রবাহের গতি হারানো, বোরো ধানের দাম কমে যাওয়া, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ না বাড়াকে দুর্বল দিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্নীতি, অবকাঠামো উন্নয়নে ঘাটতি, সরকারের নীতির দুর্বলতা, স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা ও অর্থায়নের অভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না বলে মনে করে সংগঠনটি।
 
 
স্বচ্ছতা আনতে পাঁচটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব:
 
এদিকে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা আনতে পাঁচটি পৃথক স্বাধীন কমিশন গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সরকারের আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
 
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অনেক সময়ই গরমিল দেখা যায়। ফলে অর্থনীতির সূচক ঠিক থাকে না। আবার ব্যাংকিং খাতের ভিতরে যে ধরনের ঘটনাবলী ঘটছে তার কোন স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে যতটুকু ভূমিকা পালন করার দরকার তাও করতে পারছে না। গেলেও সেটা অনেক সময় পার হওয়ার পরে হয়। কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এসব সমস্যা সমাধানে একটি স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন, কৃষি মূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিশন, স্থানীয় সরকার অর্থনৈতিক কমিশন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার বলে মত দিয়েছে সিপিডি।
 
এছাড়া অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে সরকারি কর্মচারী আইন, প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ আইন, প্রাইভেটাইজেশন, ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট ও ভ্যাট আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার বলে মনে করে সিপিডি।