প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আলোচনা বা বন্ধুত্বের মাধ্যমে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে যে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। সমুদ্রে অধিকার নিশ্চিত করতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে ২০১৪ সালের ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার রায় পেয়েছি। প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে মামলা করে সমুদ্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্কের এতটুকু চিড় ধরেনি। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদিত হওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে ভারতের জনগণ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার সংসদে আনীত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন ও দিনের অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত রাখার পর কার্যপ্রণালী বিধির আওতায় ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংসদের চিফ হুইপ হুইপ আ স ম ফিরোজ। আলোচনা শেষে স্পিকার ধন্যবাদ প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত বা পাস হয়।
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, লোকসভা ও রাজ্যসভার সকল সদস্য, ভারতের জনগণ, সোনিয়া গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনের ফলে ছিটমহলবাসী নাগরিকত্ব ও নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা পেলেও ছিটমহলবাসী তা পায়নি। ৪০ বছর তারা নাগরিকত্ব, স্বাধীনতাবিহীন অনিশ্চিত জীবনযাপন করে আসছিল। এ চুক্তি অনুমোদনের মাধ্যমে তারা নাগরিক অধিকার, ভোটের অধিকার তথা মৌলিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ পাবেন। ইতোমধ্যে ছিটমহলবাসীর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে এ স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে গেলেও এতদিন তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অনেক আগেই এ চুক্তি বাস্তবায়িত হতো। বঙ্গবন্ধু শুধু চুক্তিই করেননি। তিনি এর জন্য আইনও করে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি সমুদ্র সীমানা আইনও সম্পাদন করে যান। যার কারণে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্র সীমায় আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি।
হাসিনার নেতৃত্বেই তিস্তা চুক্তি হবে: আশা এরশাদের
ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেন, এই চুক্তি অনুমোদনের ফলে অসংখ্য মানুষের জীবন সফল হয়েছে। শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্য, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে অসংখ্য মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অবসান হয়েছে। তাদের হাতে পতাকা তুলে দেয়া হয়েছে। যারা এই চুক্তি গোলামি চুক্তি বলেছে তাদের মুখে ছাই পড়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই তিস্তা চুক্তি সম্পাদন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজের সম্পাদন: রওশন
সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পাদিত স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদিত হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও সে দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার অংশ হিসাবেই অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন। রওশন এরশাদ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিনজন সদস্যকে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়ারও প্রস্তাব করেন।
খালেদা হীনমন্যতার পরিচয় দিলেন: নাসিম
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি শাসনামলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশয় দেয়া হয়েছিল। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই ঘাঁটি উচ্ছেদ করে। এতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। যা ভারতের লোকসভায় স্থল সীমান্ত চুক্তি পাসের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে। নাসিম বলেন, স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ভারতের প্রধনামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অভিনন্দন জানালেও নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাননি। এটা বিএনপি নেত্রীর হীনমন্যতার পরিচায়ক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে দেশে-বিদেশে একের পর এক পরাজিত হচ্ছে বিএনপি। ভ্রান্ত নীতির কারণে রাজনীতিতে তারা পরাজয় বরণ করছেন।
অন্যরা যা বলেছেন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তি পাসের উদ্যোগ গ্রহণ করে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, এটা বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য। এ সাফল্য শুধু সরকারের নয়, গোটা জাতির বিজয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, শেখ হাসিনার সুযোগ্য ও দূরদর্শী কূটনৈতিক তত্পরতায় ভারতের সঙ্গে এ চুক্তি অনুমোদনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি একটি নিখুঁত মানচিত্র অর্জন করেছে। প্রস্তাবের ওপর অন্যদের মধ্যে আলোচনা করেন- ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, হাছান মাহমুদ, মোতাহার হোসেন, নূরুল ইসলাম সুজন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল ও স্বতন্ত্র এমপি তাহ্জীব আলম সিদ্দিকি প্রমুখ।
ফিরোজের কবিতা ও ‘ভুল’
চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের উত্থাপিত ধন্যবাদ প্রস্তাবে পাঁচটি ‘ভুল’ পেয়েছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের চারদিন আগে সংসদ অধিবেশনে এই প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা নিজের একটি কবিতাও পড়ে শুনিয়েছিলেন ফিরোজ।
ফিরোজ ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপনের পর সুরঞ্জিত দাঁড়িয়ে ‘ভুলগুলো’ ধরিয়ে দেন। তবে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ‘ভুল’ সংশোধনের বিষয়ে কিছু বলেননি। ফিরোজের প্রস্তাবে বলা ছিল— ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দূরদর্শী কূটনৈতিক সাফল্যে সম্প্রতি ভারতের সংসদে স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস হওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে ভারতের জনগণ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হউক।”
ফিরোজ নোটিসটি উত্থাপনের করার পর আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত দাঁড়িয়ে বলেন, “বক্তব্য দেওয়ার আগে নোটিসের কিছু ভুল সংশোধন করা দরকার। প্রস্তাবে বলা হয়েছে ‘শেখ হাসিনা সরকারের দূরদর্শী...’, এখানে হবে শেখ হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্পরতায়...।” সুরঞ্জিত বলেন, “মাননীয় স্পিকার এখানে বলা হয়েছে, ‘ভারতের সংসদ’। ভারতে কোনো সংসদ নেই। এখানে হবে রাজ্যসভা ও লোকসভা। ‘স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। চুক্তি অনেক আগেই পাস হয়েছে। ভারতের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদিত হয়েছে।” ... ‘জাতীয় সংসদে বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে’ ডিলিট হবে। ভারতের জনগণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের ধন্যবাদ জানানো হউক।”