ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এবারের সফরে তিস্তা চুক্তি নাও হতে পারে বলে ভারতীয় পত্রিকাগুলো জানাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নাকি এ চুক্তি না করার শর্তেই বাংলাদেশে আসছেন — এও জানাচ্ছে ভারতের মিডিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিষয়টি এতোই স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
দু’দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এ চুক্তি করার বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। ২০১১ সালে মনমোহন সিং-এর সফরের সময়ে ভারত সরকারের দিক থেকে তিস্তা চুক্তি না করার বিষয়ে কোন দ্বিধা ছিল না। এবারে নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময়েও এ চুক্তি করার বিষয়েও কোন দ্বিধা দেখা যায়নি। বরং দু’দেশের সরকার প্রধানই এ সফরেই চুক্তি করবার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে বাদ সাধছেন মমতা। যদিও এ বছর ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফরের সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। হাসিনাদির সঙ্গে আলাপ করে তিস্তা সমস্যার সমাধান করব।’ সর্বশেষ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভারতের লোকসভায় সীমান্ত চুক্তির বিল উত্থাপন করে বলেছেন, সীমান্ত সমস্যার সমাধানের পর তিস্তার সমস্যার সমাধান করাও কোন কঠিন কাজ হবে না।’ কিন্তু তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় একটা অস্বস্তি যে বিরাজ করছে না মানুষের মনে তা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ যাত্রায় (৬ ও ৭ জুন ঢাকা সফর) তিস্তা চুক্তি না করার আশ্বাসে তার আসন্ন ঢাকা সফরে সঙ্গী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। তবে বাংলাদেশে গিয়ে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে প্রকাশ্যে কোন কথা না বললেও শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে জট ছাড়াতে উদ্যোগী হবেন প্রধানমন্ত্রী (মোদী)। এবং তাতে কোন আপত্তি নেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে দুটি বড় প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য ভারতের ওপর চাপ রয়েছে তার একটি হলো সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন, যা ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। অপরটি হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি সই করার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতা ও শেষ মুহূর্তে আপত্তি তুলে মনমোহনের সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ফলে ওই সময়ে তিস্তা চুক্তি হয়নি।
২০১১ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে ঢাকা ও দিল্লী তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে একমতে পৌঁছেছিল। তিস্তার পানির ২০ শতাংশ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য ছেড়ে দিয়ে ৪০ঃ৪০ অর্থ্যাত্ অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ ও ভারত সমান ভাগ করে নেবে বলে চূড়ান্ত হয়েছিল। এদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা চুক্তির বিষেয়ে সব বিষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটা এখন রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপার। রাজনৈতিক মতৈক্য হলে চুক্তি সম্পাদনে কোন সময় লাগবে না।
এদিকে, তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পানি প্রবাহ কমে আসায় প্রতিবছর কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিস্তা নদীর ওপরে নির্ভরশীল কৃষকদের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। অপরদিকে, তিস্তা নদী পানিশূন্য হয়ে নদীর উজান ও ভাটিতে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। দেশের সর্ববৃহত্ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ চরম পানি সংকটে ব্যাহত হয় সেচ কাজ। ঐতিহাসিকভাবে শুষ্ক মৌসুম অর্থাত্ মার্চ -এপ্রিল মাসে তিস্তায় পানিপ্রবাহ থাকে ৫ হাজার ৮৮৭ কিউসেক। সেখানে এ বছর ১১ মার্চ পানি প্রবাহ ছিল ৩৫০ কিউসেক, যা ছিল এ যাবত্কালের সর্বনিম্ন প্রানিপ্রবাহ। গত বছর ফেব্রুয়ারি - মার্চ মাসে পানিপ্রবাহের গড় ছিল ৫৫৩ কিউসেক। এদিকে, ২০১৩ সাল এবং তার আগের বছরগুলোতে একইসময়ে পানিপ্রবাহ ছিল ২৪০০ কিউসেক থেকে ৩৫০০ কিউসেক। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রাপ্ত এ তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, গত বছর থেকে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণেই এমনটা হচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের কৃষকরা।
এদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, যদিও ‘তিস্তা চুক্তির বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচ্যসূচিতে এখনও রাখা হয়নি। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে পানির ব্যাপক হ্রাসের বিষয়টি তুলে ধরে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত ন্যায্য হিস্যার অনুরোধ জানানো হবে। কারণ এভাবে চললে তিস্তা সেচ প্রকল্প আগামি মৌসুমে চালানো কঠিন হবে।’ সেইসঙ্গে পররাষ্ট মন্ত্রণালয় এও জানাচ্ছে, অনেক জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মমতা যে ঢাকায় আসছেন, এটা খুব ভালো একটা দিক। তবে তিস্তা চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কিছু নেই। কারণ ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে দু’দেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত হয়েছে। এখন পানি ভাগাভাগিতেই চুক্তি আটকে আছে। তাই দু’দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে পানি ভাগাভাগির বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। এতে মমতা উপস্থিত থাকলে খুব ভালো হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, চুক্তি না হলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ে ইতিবাচক কিছু একটা ঘোষণা আসবে নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন সফরে।