বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত অবস্থানের ভিত্তিতেই স্থাপিত। এ সম্পর্ক এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে একে আরও এগিয়ে নিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নিঃসন্দেহে বাড়াতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন বাংলাদেশ সফর সম্পর্কের সেই দিকটিতেই নির্দেশনা দেবে। গত সোমবার বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয়ে এক বৈঠকী আলোচনায় এ মতামত তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তার আলোচনার সারবক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো—
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক আলোচনার একটি বড় অংশজুড়েই থাকে দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটি বা সংযোগ। ভারতের সাথে আমাদের কানেটিভিটি বা সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের চাহিদায় বেশ খানিকটা ভিন্নতা আছে। ভারত অবকাঠামোগত যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি সড়ক, রেল ও নৌপথে আগ্রহী। এতে বাংলাদেশ তেমন আগ্রহী নয়। আমরা সমন্বিত কানেকটিভিটি চাই। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ। যেমন—বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছিল, ভারতের টিভি চ্যানেল আমরা দেখতে পারি, আমাদের চ্যানেল ভারতের জনগণ দেখতে পারে না। ভারতীয় চ্যানেল টাকার বিনিময়ে দেখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ বিনা পয়সায় দেখাতে চায়। তারা বলছে, টাকার বিনিময়ে দেখাব। এর কারণ হলো—তাদের স্যাটেলাইট আছে, আমাদের নেই। এজন্য আমরা তাদেরকে ছাড় দিতে বলি। আমাদের স্যাটেলাইট হয়ে গেলে আর লাগবে না। অর্থাত্ আমরা বৃহত্তর অর্থেই কানেকটিভিটি চাই। নেপাল ও ভুটানের সাথেও কানেকটিভিটি চাই।
কানেকটিভিটির রোড-রেল দিয়ে এপারের জিনিস ওপারে যাওয়া কিংবা ওপারের জিনিস এপারে আসার মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের কোনোটিতেই মৌলিক পরিবর্তন হবে না। এর চেয়ে বড় কথা, এটি ভারতের মনিপুর ও মিজোরামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
কানেকটিভিটির সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। আমাদেরকে আগে ঠিক করতে হবে, আগে সড়ক দরকার না উত্পাদন দরকার। চীনের দিকে তাকালে দেখব, তারা আগে উত্পাদনে গেছে পরে সড়ক হয়েছে। কানেকটিভিটর ক্ষেত্রেও আমাদের দরকার উত্পাদনকেন্দ্রিক কাঠামো। এটি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করলে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই পক্ষেরই লাভ হবে। এমনকি মিজোরাম-মনিপুরসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যারা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে চায়, তাদের সাথেও বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে। কেননা, অংশীদারিত্ব ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বা ভারতের আহমেদাবাদ, মুম্বাইসহ অন্য কোনো রাজ্য থেকে পণ্য পরিবহন করে আসাম, মনিপুর বা মিজোরামে পৌঁছে দেওয়া বা অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো মেনে নিবে না। এ বিষয়টি ভারতকেও বুঝাতে হবে।
বাংলাদেশে সস্তা শ্রম আছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও এত সস্তা শ্রম নেই। তাই তাদের সাথেও অংশীদারিত্বের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। শুধু সড়ক ও রেলওয়ে কানেটিভিটি দিয়ে বাংলাদেশি জনগণকেও উত্সাহী করা যাবে না। যে পণ্য পরিবহন হবে তার উত্পাদন ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান লাগবে।
নরেন্দ্র মোদী চীনের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সে দেশে তিনবার গিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে চীন সফরে গিয়ে ২৩ বা ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ভারতে আনতে সফল হয়েছে। ভারত ও চীনের আগের সম্পর্ক এখন নেই। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের ব্যাপারে মোদী যথেষ্ট সচেতন। সবমিলিয়ে, বাংলাদেশ-ভারত-চীন মিলে একসাথে উত্পাদনে যেতে পারে।
নরেন্দ্র মোদীর মূল ম্যাজিক তার যোগ্যতা ও গতি। গুজরাটে সেটা সে দেখিয়েছে। চীনের পাশেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অনুন্নত রেখে সেই গতি তিনি অব্যাহত রাখতে পারবেন না।
আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টসের ২০ শতাংশ সুতা আসছে ভারত থেকে। মেশিনগুলো চীন থেকে আসছে। সে হিসেবে ভারতের সাথে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কে যদিও ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঘাটতি রয়েছে, কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার সাথে উদ্বৃত্ত রয়েছে। ভারত বা চীন থেকে নেওয়া কাঁচামালের কারণেই এ উদ্বৃত্ত। সবমিলিয়ে একটি অবস্থা দাঁড়িয়েছে। শুধু ভারত বা চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি দেখলে তো আমাদের উন্নতি হওয়ার কথা নয়। আবার চীনে শ্রমের মূল্য, উত্পাদন মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। তাই আউটসোর্সিংয়ের সুযোগটা বাংলাদেশ নিতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারত কর্তৃপক্ষ কতগুলো পণ্যের ওপর বড় আকারের ট্যারিফ ব্যারিয়ার উঠিয়ে নিয়েছে। এতে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। তবে বিশ্বায়নের এ সময় বাংলাদেশ-ভারত-চীনের একসাথে উত্পাদন ও ব্যবসায় যুক্ত হতে পারে। এজন্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরও নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের বড় ব্যবসা বা ব্যবসার ধরন বদলাতে হবে।
নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এক বছর কেটে গেছে এবং ইতিমধ্যে ১৮টি বিদেশ সফর করেছে। তাই নরেন্দ্র মোদীর এ সফরটি শুভেচ্ছা সফর নয়। বাংলাদেশের সরকারের সাথে তার একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব আছে। বাংলাদেশের শাসনজনিত ঘাটতির দিকে তার নজর ছিল। বন্ধুভাবাপন্ন বাংলাদেশে এতদিনে না আসাটা বিব্রতকর। কেননা নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশকে তাদের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশও সুযোগ পেলে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তাই মোদীর সফর বাংলাদেশ সরকারের জন্যও ইতিবাচক।
মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ১৮টি বিদেশ সফরেই চমক রেখেছেন। তিনি চমক দেখাতে পছন্দ করেন। বাংলাদেশেও একটি চমক দেখানোর চেষ্টা তিনি করবেন। তিনি বাংলাদেশে এমন মনোভাব প্রদর্শন করবেন না যে, তিনি কোনো একটি সুনির্দিষ্ট দলের সাথে আছেন। এটি বিভিন্ন দলের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে কিংবা অন্য উপায়েও হতে পারে।
স্থল সীমান্ত চুক্তির ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বিষয়। এখন যে চুক্তি হতে যাচ্ছে এর কৃতিত্ব বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদী নিতে পারেন না। কেননা চুক্তির বিষয়গুলো ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বরই মীমাংসা হয়ে গেছে। ভারতের গত নির্বাচনে মোদী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এখন চীন বা অন্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার জন্য এ চুক্তিতে স্বাক্ষর তাকে করতেই হতো। কেননা এতে অন্য পক্ষগুলো তাদের চুক্তি বাস্তবায়ন বা স্বাক্ষর করার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য নরেন্দ্র মোদীর মমতার বা পশ্চিমবঙ্গের সমর্থন দরকার নেই। মূলত রাজনৈতিক সমর্থন দরকার। সংসদে মোদীর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় চুক্তি স্বাক্ষরে সংবিধানগত বা আইনি কোনো বাধা নেই। শুধু মমতার কারণে এ চুক্তি সম্পাদনে দেরি করলে মোদীর নেতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর চুক্তিটি ভারতকে আজ কিংবা কাল করতেই হবে। তাই এ ঝুঁকি মোদী নিবে না। তাই এ সফরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত না হলেও কবে নাগাদ হবে সে ধরনের বার্তা থাকবে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কখনোই একেবারে খারাপ হয়নি। এটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি যে দলই থাকুক না কেন। দুই দেশের বাণিজ্যিক বিনিময়ের চিত্র দেখলে এটি বুঝা যায়। কেননা দুই দেশের বাণিজ্যিক বিনিময়ের সূচক কখনো নিচে নামেনি বরং উপরে উঠেছে সবসময়। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভারত এখনই ট্রানজিট চাইলেই আমরা দিতে পারব না। কেননা আমাদের সেই অবকাঠামো নেই। তাই আগে উত্পাদন করা দরকার। উত্পাদন হলে, অবকাঠামো হবে। আর ট্রানজিট শুধু ভারতের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জন্যও নিরাপত্তা ইস্যু। কেননা সুবিধা না পেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো বাংলাদেশকেও শত্রু ভাববে। এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে, কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে যেমন ভারতবিরোধী রয়েছে, তেমনি ভারতেও বাংলাদেশবিরোধী শক্তি আছে। তাদের অনেকেই আমাদেরকে পাকিস্তানি মনে করে। বাংলাদেশের সাথে বিরোধটা এখনই এত তাড়াতাড়ি যাবে না। উন্নয়নগত এবং মানসিক তফাত রয়েছে। কেননা তারা আমাদের সম্পর্কে জানে না। আমরা তাদের টিভি দেখি, প্রচুর লোক ভ্রমণে যাই। কিন্তু তারা আমাদের টিভি দেখে না, খুব কম সংখ্যকই ভ্রমণে আসে।
দুই দেশের সরকার এবং জনগণের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব রয়েছে তা দূর করতে ভারত ৫ বছর সে দেশে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো বিনা ফিতে দেখাতে পারে। এ ৫ বছরের মধ্যে আমাদের স্যাটেলাইট হয়ে যাবে। দূরত্ব নিরসনের বড় মাধ্যম হবে গণমাধ্যম। ছাত্রসহ পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। আমাদের পরিচিতি মাধ্যমটা একপথে হচ্ছে। বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে জানছে কিন্তু ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে জানছে না।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শুধু হাট বসালে হবে না। সীমান্তে হাসপাতাল, সিনেমা হল, বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। দুই দেশের মানুষকে এগুলো ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত কানেকটিভিটি বা সংযোগ সমন্বিত হতে হবে। যৌথ উত্পাদনক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন। এটি শুধু সড়ক তৈরি নয়, উত্পাদন ও দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে হতে হবে।
লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
