ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশে প্রথম সফরকে তিনটি শব্দ দিয়ে বিবৃত করা যেতে পারে। শব্দত্রয় হলোঃ নেতৃত্ব, বাধ্যবাধকতা ও সুযোগ। তাঁর পৌরহিত্বে ৪১ বছর ধরে ঝুলে থাকা ভারত-বাংলাদেশ ’স্থল সীমান্ত চুক্তি’ ভারতের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেই বলছেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে এই সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পরও সেই বিতর্ক বহাল রয়ে গিয়েছে। আমরা এই বিতর্কের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছি এবং সেটা সর্বসম্মতির ভিত্তিতে। এটা আদৌ সামান্য ঘটনা নয়।’
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ যে, সীমান্ত বিল সংসদে পাস করিয়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর প্রথম ঢাকা সফরে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছিলেন। স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক মতৈক্য ঢাকায় তুলে ধরতেই প্রধানমন্ত্রী মোদী বাংলাদেশ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট ভারতীয় অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীদের সফরসঙ্গী হতে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরেই বিভিন্ন মহাদেশের ১৯টি দেশে সফর করতে হয়েছে। তিনি জানেন, বৈচিত্র্যে, বৈসাদৃশ্যে ও প্রকাণ্ডতায় ভরপুর ভারতে উন্নয়ন ঘাটতি বিশাল। পৃথিবীর আদিমতম শ্রম বিভাজন তথা বর্ণ অসমতা যেমন রয়েছে, তেমনি আয়, মানব উন্নয়ন ও সামাজিক প্রগতির ক্ষেত্রে বৈষম্য বিদ্যমান। মূলধন সংকট আরো প্রকট। সেকারণেই ‘মেইক ইন ইন্ডিয়া’ শ্লোগান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ফেরি করছেন। চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘নতুন উন্নয়ন ব্যাংক’ গঠনের ঘোষণা দিচ্ছেন। চীনের নেতৃত্বে ‘এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকে’ যোগ দিচ্ছেন। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দিবসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টকে তিনি সর্বপ্রথম প্রধান অতিথি হিসেবে ভারতে নিয়ে এসেছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর ওয়াশিংটনের যুক্ত ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল —‘চলিয়ে সাথ সাথ’ এবং ‘দিল্লি ঘোষণা’র শিরোনাম — ‘সানঝা প্রয়াস, সবকা বিকাশ।’ প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইসরাইল সফরের ঘোষণা দিয়েছেন। অতএব, অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা তাঁকে জানান দিচ্ছে ‘জোট নিরপেক্ষতা’ থেকে ’বহুপাক্ষিকতা’র দিকে ভারতকে অবস্থান নিতে হবে। একইভাবে ’অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা’ই বাংলাদেশে তাঁর সফরের এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ করছে। ভারতের পশ্চিম ভূখণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী আরো বলছেনঃ ‘আয়তনে বাংলাদেশ ছোট হলেও আমাদের কাছে তার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক।’ তিনি এও জানেন যে, চীন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে বন্দর উন্নয়নে অর্থায়ন করে ভারত মহাসাগর জুড়ে ’স্ট্রিং অব পার্লস’ তৈরি করছে। চীন ‘সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’ ও ‘টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড’ নিয়ে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের কেনা অস্ত্রের ৮২ শতাংশের উত্স চীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ’পিভট টু এশিয়া’ নিয়ে অগ্রসরমান। তাই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘এশিয়া প্যাসিফিক ও ভারত মহাসাগরীয় যুক্ত কৌশলভিশন’ স্বাক্ষর করেছেন। জাপান বাংলাদেশকে নিয়ে ’বিগ বি’ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। একদিকে ভারত ‘নেকলেস অব ডায়মন্ডে’র কথা বলছে, অন্যদিকে ভারত ও চীন ‘বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার ইকনোমিক করিডোর’ উদ্যোগে শামিল হচ্ছে।
পৃথিবীব্যাপী জোটবদ্ধতার কৌশলের পরিবর্তন হচ্ছে। শুধুমাত্র সনাতনী ভূরাজনৈতিক তথা নিরাপত্তা কেন্দ্রিক স্বার্থ অথবা অর্থনৈতিক মৌল কাঠামো থাকলেই যুথবদ্ধতা বা বিনিয়োগ হচ্ছে না। ভূকৌশলগত অর্থনৈতিক স্বার্থই এখন জোটবদ্ধতার প্রধান নিয়ামক। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণের ভৌগলিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অবস্থিতি, বাংলাদেশকে ভূকৌশলগত অর্থনৈতিক অবস্থান প্রদান করেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফর বিদ্যমান সন্দেহ ও আস্থার সংকট কাটিয়ে একটি সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও অচলায়তনিক পরিবর্তন বিমুখেরা এখনও ভারতকে ’দাদাগিরি’ অথবা ‘জৈষ্ঠ ভ্রাতা’ চরিত্রে দেখতে চান। প্রধানমন্ত্রী মোদী উল্লেখ করছেন ‘পূর্বমুখীন’ এবং ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা। একদিকে গণতন্ত্র, ভিন্নমত এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা ও সংহতি যেমন বিবেচ্য এবং অন্যদিকে দু’দেশের জনগণ-ভিত্তিক সম্পর্ক বিকাশ ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিবেশী অশান্তিতে থাকলে আমিও শান্তিতে থাকতে পারব না।’ সবচেয়ে বড় কথা তাঁর মেনিফেস্টোতে উল্লেখ করছেন ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। তাঁর এই শ্লোগানকে আন্তর্জাতিকীকরণ করলে দাঁড়ায়—প্রতিবেশীর সাথে ‘সমতাভিত্তিক বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এবং প্রতিবেশী কর্তৃক ‘ভারসাম্যপূর্ণ স্বকীয় উন্নয়নমুখী কূটনীতি’।
লেখক :চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান
