২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ভারতসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এইদিন ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য ভারতীয় জনতা দল তাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদীর নাম ঘোষণা করে। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ বেশিরভাগ দল থেকেই এই ঘোষণার জন্য বিজেপি’র সমালোচনা শুরু হয়। মোদী দলের নির্বাচনী প্রচারণা কমিটিরও প্রধান ছিলেন। গণমাধ্যমে মোদীর নাম ঘোষণার প্রতিবেদন করতে গিয়ে সবাই ফিরে যায় ২০০২ সালের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায়।
প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় মোদী বলেছিলেন, ‘বিজেপি আজ দেশের বড় মিশনে একজন সামান্য সৈনিককে পাঠালো। তবে ঈশ্বর আমাকে প্রচুর শক্তি দিয়েছে।’ বিজেপি’র নির্বাচনী প্রচারণায় ‘হিন্দুত্ববাদিতা’ গুরুত্ব পাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা। এদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে খোলা চিঠি প্রকাশ করেছিলেন। তারপরও জনগণের রায়ে ক্ষমতায় আসেন মোদীই।
বুদ্ধিজীবী মহলে যে বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় তা হলো ধর্ম এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকবে কিনা তা নিয়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কাটা জোরালো ছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হবে এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। নির্বাচনের আগে নেটওয়ার্ক ১৮ চ্যানেলে ‘থিংক ইন্ডিয়া, ডায়ালগ ফোরাম’ নামের একটি অনুষ্ঠানে মোদী তার পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার প্রধান কাজ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা। তিনি প্যারা ডিপ্লোম্যাসি নীতিরও ধারণা দেন। এর মাধ্যমে যেকোনো রাজ্য এমনকি শহরও তাদের স্বার্থের জন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। যদিও তার এই ভাবনাটা তখন গণমাধ্যমে খুব বেশি প্রচার পায়নি। ক্ষমতায় এসেই মোদী তার পররাষ্ট্র নীতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র তথা দুই দশক ধরে এ অঞ্চলে গুরুত্ব পাওয়া ‘লুক ইস্ট পলিসিতে’ মনকে নিমগ্ন করেন। এশিয়ার দেশগুলোই তার পররাষ্ট্র নীতির মূল অংশ হয়ে ওঠে।
নির্বাচনী প্রচারণা এবং ওই সময়ের কর্মকাণ্ড যে রাষ্ট্র পরিচালনায় তথা পররাষ্ট্র নীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে না তার প্রথম দৃশ্যপট শুরু হয় শপথ অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে। সমালোচকদের প্রতি দ্বিতীয় আঘাতটি হানেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদী সফরের তালিকায় প্রথম দেশ হিসেবে ভুটানকে রেখে। মোদী এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাদের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকেই বেছে নেন। মোদী তার একশ’ দিনের মধ্যে ভুটানসহ নেপাল এবং জাপান সফর করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তার বিদেশি সফর হিসেবে বেছে নেন প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশকে। এরপর তিনি নেপাল, মিয়ানমার, সিংগাপুর, ভিয়েতনাম, বাহরাইন, কাবুল, মালদ্বীপ এবং চীন সফর করেন। মোদী নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ খাত এবং বাণিজ্যক অংশীদারিত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। এর আগে অভিযোগ ছিল, ভারত সার্ককে শক্তিশালী করতে চায় না। কিন্তু মোদী সেই সমালোচনার সমাপ্তি টানলেন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মোদী তার ক্ষমতার এক বছরে বিশ্বে তাক লাগান বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি পার্লামেন্টে অনুমোদনের মাধ্যমে। গত ৭ মে ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে স্থলসীমান্ত বিল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে ইতিহাসের রাখি বন্ধন গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত যেভাবে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সেই একইভাবে ৪১ বছরের সীমান্ত সমস্যার সমাধানে সম্পর্কের হাত প্রসারিত করলো দেশটি।
মোদীর ৬ ও ৭ জুনের সফরে দুই দেশের মধ্যে আরেকটি আলোচিত সমস্যা তিস্তা চুক্তির বিষয়ে একটা সমাধান মিলবে বলেই বাংলাদেশের মানুষ আশা করে। অনেকে অবশ্য এতটা আশাবাদী এখনো হতে পারছেন না। তবে মোদীর সফরে যেহেতু মমতা আসবেন সেক্ষেত্রে তিনি যে চুক্তির একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দেবেন সেই আশা অন্তত সবাইই করছেন। স্থল সীমান্ত চুক্তি পার্লামেন্টে অনুমোদনের পর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক পত্রিকা লাইভ মিন্ট’র সঙ্গে সাক্ষাত্কার দেন। বিলটি পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী অন্য দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হতে পারে সেই সম্পর্কেও একটা ধারণা দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী আলোচনার পথে হেঁটেছেন। তিনি আসামের বিধানসভা নির্বাচনের চেয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া অঙ্গীকারকে বড় মনে করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। এধরনের সমস্যাগুলোর সমাধানের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নেপাল এই প্রসঙ্গটি আনতে পারে। তারা মনে করতে পারে আমরা মোদীর কাছে যাব, কারণ মোদী এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। এভাবে আফগানিস্তান এবং মালদ্বীপ সমস্যার সমাধানও হতে পারে। পাকিস্তানেও এই ধারণা সৃষ্টি হবে যে, ভারত দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখতে চায় না। মনে করা হয়, ভারত প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখতে ভালবাসে। বাংলাদেশের সঙ্গে এই সমস্যার সমাধানের ফলে পাকিস্তান এখন আর ভারতকে দোষারোপ করতে পারবে না।
এশিয়ায় চীন এবং ভারতকে ক্ষমতার বিস্তারের দিক থেকে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করা হয়। নির্বাচনের আগে মোদী চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে কড়া বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত এবং সমপ্রতি চীনে মোদীর সফর সেই প্রচারণার কঠোরতায় শিথিলতা আসে। মোদী চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ব্যাপারে তার মত প্রকাশ করেন।
চীন দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মেরিটাইম সিল্ক রোড প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে অনেক আগে থেকেই। এতে ভারতের সহায়তা আশা করছে চীন।
মোদীকে নিয়ে প্রধান হুমকি ছিল সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে। গত এক বছরে এর কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। তার অর্থনীতিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি সমালোচিত হয় দেশি-বিদেশি মহলে। এই বিষয়টিই মোদী সরকারকে সবেচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চার্চে হামলা, কট্টরপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলোর ঘরওয়াপসি তথা ধর্মান্তরকরণ কার্যক্রম, বিজেপি নেতাদের ধর্মীয় উস্কানিমূলক মন্তব্যে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন মোদী। এমনকি ভারত সফরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এই ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হিন্দুত্ববাদিতা কার্যক্রম কমে আসে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিন প্রতিবেদন প্রকাশের পর। ধর্মীয় বিষয়ে মোদী সরকার যে আগের চেয়ে সচেতন ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছেন তার প্রমাণ মোদী সরকারের এক বছরের পূর্তিতে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের বক্তব্য। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ কিংবা মুসলমানদের শরীয়াহ আইন বাতিল করে ভারতীয়দের জন্য দেওয়ানি বিধি চালু, জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য বিশেষ মর্যাদাবাহী ৩৭০ ধারা বাতিল করার ম্যান্ডেট আমরা পাইনি। তিনি বলেন, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের অন্তত ৩৭০ আসনে জিততে হবে। অথচ নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি এসব ইস্যুকে তাদের মূল ইস্যু বলে আখ্যায়িত করেছিল। এমনকি প্রচারণায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা নাগরিকদের বিতাড়িত করার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই মোদী সরকারই এখন পরিকল্পনা করছেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া হিন্দু ও শিখদের বৈধতাও দেয়ার।
