‘সবার আগে থাকতে হবে সবার সঙ্গে থাকতে হবে।’ এটাই হচ্ছে নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদীর রাজনৈতিক জীবনের স্লোগান। এই মন্ত্র তাঁকে শুধু জীবনযুদ্ধেই জয়ী করেনি, রাজনৈতিক অঙ্গনে সফল নেতার আসনে বসিয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহত্ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার তাঁকে দিয়েছে। তাঁর প্রদত্ত স্লোগানের মর্মার্থ হলো, মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে এবং সেখান থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
মোদীর এই স্লোগানের সঙ্গে অদ্ভুত সামঞ্জস্য পাওয়া যায় সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের একটি লেখার ভেতর। আমার এখন পুরোপুরি স্মৃতিতে নেই বটে, তবে এলোমেলো যতটুকু মনে আছে তাহলো, তিনি তাঁর ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’ নিবন্ধটির এক স্থানে বলশেভিকদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের পথ চলতে হবে জনগণ থেকে এক পা এগিয়ে। তোমরা এত এগিয়ে যাবে না, যাতে জনগণ তাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, কিংবা এত পিছিয়ে থাকবে না, যাতে মনে হয় তোমরা স্বতঃস্ফূর্ততার লেজুড়বৃত্তি করছ। তোমরা এক পা এগিয়ে থাকবে মানে তোমরা সামনে থাকলে জনগণই অনিবার্যভাবে তোমাদের নেতৃত্বই গ্রহণ করবে।’ প্রায় সোয়া শতাব্দী আগের এই রাজনৈতিক দর্শনটি আশ্চর্যজনকভাবে মোদীর রাজনৈতিক পথ পরিক্রমের সঙ্গে মিলে গেছে।
এই দৃষ্টান্তটা এজন্যই যে যাঁরা রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে অথবা রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য পেয়েছেন—এটাই হতে হয় তাদের সেই সাফল্যের কৌশল। নরেন্দ্র মোদী তাদেরই একজন। কতখানি দৃঢ়তা, কতখানি সাহস, লক্ষ্যের প্রতি কতখানি অবিচল নিষ্ঠা থাকলে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত এক চা বিক্রেতা কিশোর ভারতের রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তা সত্যিই গভীরভাবে ভাবতে হবে।
নরেন্দ্র মোদীকে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে এই কারণে যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কাজটি হাতে নিয়েছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক সূদৃঢ়তর করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা এত অল্প সময়ে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার যে প্রজ্ঞার পরিচয় আমরা পেলাম তাতে অভিভূত হতে হয়। যে ক্ষেত্র থেকে মোদীর রাজনীতির সূচনা তা বাংলাদেশের কোনো কোনো মহলকে বেশ উদ্বিগ্ন করেছিল এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমরা দেখলাম ক্ষুদ্র রাজনীতির গণ্ডির মধ্যে নিজেকে অবরুদ্ধ না করে তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে পরিব্যাপ্ত করেছেন যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গে। আমরা ধারণা, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় এত দূরদর্শী নেতার আবির্ভাব আর ঘটেনি। কারও কারও মনে হতে পারে এটি অতিরঞ্জন মন্তব্য। কিন্তু আমার যুক্তি হলো—প্রথমত, মোদী সেই ব্যক্তি, যিনি ভারতের রাজনীতিতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন; দ্বিতীয়ত, মোদী একটি পারিবারিক ধারার অচলায়তনের প্রাচীর জনগণের শক্তিতে বিচূর্ণ করেছেন; তৃতীয়ত, মোদী উগ্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সেই দলীয় ধারার বিপরীতে নিজের অবস্থানকে সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন; চতুর্থ, প্রবল বৈশ্বিক প্রতিপক্ষ চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও মৈত্রীর হাত প্রসারে এতটুকু কুণ্ঠিত হননি; পঞ্চমত, জাপান থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ থেকে আফ্রিকার সংকটসংক্ষুব্ধ অঞ্চলগুলো পর্যন্ত সর্বত্র নরেন্দ্র মোদী যেভাবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেছেন তা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে; ষষ্ঠত, শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনই নয়, ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তিনি ২০০২ সালের গুজরাটের দুঃসহ স্মৃতিকে অতিশয় নৈপুণ্যের সঙ্গে ঢাকতে পেরেছেন; সপ্তমত, দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার পথে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার আন্তরিক চেষ্টা শুরু করেছেন; অষ্টমত, রাজ্যগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব হ্রাস করার সফল উদ্যোগ নিয়েছেন; নবমত, শক্তিশালী ভারত গড়ার জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
মাত্র একটি বছরে ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এত সুবিশাল অর্জন ইতোপূর্বে আদৌ হয়েছে কি-না সে সম্পর্কে আমার প্রকৃত সংশয় রয়েছে। এই মোদী প্রথম পা রাখছেন বাংলাদেশে। কথা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের কোনো অর্জন ছাড়া তিনি বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করবেন না। সাতচল্লিশ থেকে ঝুলে থাকা সীমান্ত সংকটের প্রধান বিষয় ছিটমহল সমস্যার নিরসন করেছেন। আরও অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে। মোদীর এই সফরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয়ে অবশ্যই আলোকপাত ঘটবে। এক. জঙ্গি প্রতিরোধে একটি আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগ যা এই অঞ্চলকেই নিতে হবে এবং দুই. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ যা দুই অসাম্প্রদায়িক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
মোদীর আগমন বাংলাদেশের মানুষের জন্য শান্তি, মৈত্রী ও সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়ে আসবে এটা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই কামনা করবে, কারণ ভারত বাংলাদেশের দুঃসময়ের সাথি এবং সুসময়ের সঙ্গী।
