সীমান্ত চুক্তির মতো তিস্তাও হবে :মোদী

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৫, ২৩:৪৩
Åদুই বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ সহায়তা পাবে বাংলাদেশ Åঘাটতি কমাতে বাণিজ্য চুক্তি Åবাংলাদেশি পণ্যের মান যাচাইয়ে ভারতীয় সহায়তা Åচট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে ভারত Åমংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল Åনৌপথে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট প্রটোকল Åব্লু ইকোনোমিক জোন ও সমুদ্র বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা Åজলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে ভারত Åকলকাতা-ঢাকা-আগরতলা ও ঢাকা-গৌহাটি বাস সার্ভিস চালু Å২ বছরের মধ্যে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আসবে ভারত থেকে Åগৌহাটিতে বাংলাদেশ মিশন, সিলেট ও খুলনায় ভারতের মিশন

ঐতিহাসিক সফরে এসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্থল সীমান্ত চুক্তির মতো বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানি চুক্তির অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানের কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ২০২১ ও ২০৪১ সালের ভিশন অর্জনে সফলতা কামনা করেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন সম্ভাবনার যুগে ও অধিকতর উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছি। ভারত আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ। আমরা পরস্পরের উন্নয়ন সহযোগী। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী দুই দেশের মধ্যে সংযোগ (কানেকটিভিটি) স্থাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করে এক্ষেত্রে সহায়তার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি উভয়ের উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেন।

শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একান্ত বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেন। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবেশ, সীমান্ত ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং দলিল বিনিময় হয়। দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এসব সম্পাদিত হয়।

শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতিতে স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনপত্র বিনিময় হয়। তিনজনই আনুষ্ঠানিকভাবে কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে আগরতলা পর্যন্ত এবং ঢাকা থেকে গৌহাটি পর্যন্ত বাস চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

দুই প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগে প্রায় ২০ মিনিট একান্ত বৈঠক করেন। মমতা ব্যানার্জিও দুই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ বৈঠক করেন।

দৃঢ়চেতা ও হাস্যোজ্জ্বল নরেন্দ্র মোদী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর বক্তৃতায় বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মহানুভবতা ও উষ্ণতায় আমি মুগ্ধ এবং সম্মানিত। অগণিত মানুষের শুভেচ্ছায় আমি প্রথম বাংলাদেশে এসে সমৃদ্ধ হয়েছি। বাংলাদেশ ও ভারত কেবল প্রতিবেশী নয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা এবং আবশ্যিকভাবে ক্রিকেট ভক্তের জন্য দুই দেশ অভিন্ন।

তিনি দুই দেশের মধ্যে বাস চলাচল প্রসঙ্গে বলেন, মানুষ এর ফলে সহজে চলাচল ও ঘনিষ্ঠভাবে মিলতে পারবে। আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে সফল যাত্রী হিসাবে এগুতে চাই। এজন্যই ভারতের যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি তা বাংলাদেশেরও ভবিষ্যত্ হিসাবে কামনা করি। আমরা আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা ও যোগাযোগ যত গভীর করব ততই অর্থনীতি সুসংহত হবে। জনগণ সংযুক্ত হবে ও জাতি সমৃদ্ধ হবে। সার্কের স্বপ্ন বাংলাদেশের উপহার। এজন্য আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে চাই।

নরেন্দ্র মোদী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতে সকল দলের মধ্যে ঐকমত্য আছে। স্থল সীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটেছে। সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে নিয়েছি।

নদীর পানি বন্টন প্রসঙ্গে মোদী বলেন, পানি বন্টন একটি মানবিক ইস্যু। উভয় দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা এতে প্রভাবিত হয়। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, রাজ্য সরকারগুলোর সহায়তা নিয়ে তিস্তা ও ফেনী নদীর স্বচ্ছ সমাধানে পৌঁছাতে পারব। অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২১ ও ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেখ হাসিনা সফল হবেন। বাংলাদেশের সফলতা এই অঞ্চল ও সারাবিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই আমাদের অংশীদারিত্বই আমাদের সফলতা। আমরা প্রচুর সম্ভাবনার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের অবস্থান থেকে বন্ধুত্বের চেতনায় সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করব। আমরা অর্থনৈতিক বন্ধনে বাণিজ্য ও পরিবহন চুক্তি নবায়ন করেছি। বাণিজ্য বাড়াতে উপকূলীয় নৌ চলাচল চুক্তি সই হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বর্ডার হাট, সমুদ্র সহায়তা, অর্থনৈতিক সহায়তার নতুন যুগের সূচনা করবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেব।

তিনি বলেন, দুই বছরের মধ্যে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি করবে বাংলাদেশ। সড়ক, রেল, নদী, সমুদ্র, বিদ্যুত্ সঞ্চালন, জ্বালানি পাইপলাইন ও ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়বে। বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের সংযোগ ও সহযোগিতা আরো গভীর করা হবে। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অন্যান্য উন্নয়নে নতুন দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দেয়া হবে। মানব পাচার, জাল ভারতীয় মুদ্রারোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ছে।

‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে নরেন্দ্র মোদীর সফরকে বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ৬৮ বছরের মানবিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়ায় আমরা আনন্দিত। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী স্থল সীমান্ত চুক্তির জন্য ভারতের সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ভারত আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ও আমরা একই সঙ্গে পরস্পরের উন্নয়ন সহযোগী। উপকূলীয় নৌ চলাচল চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন প্রটোকল স্বাক্ষর, নতুন বাস সার্ভিস ফ্ল্যাগ অফ এ অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ প্রতিষ্ঠার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের দৃষ্টান্ত। এরমধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব। সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসার প্রসারে নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। সীমান্ত শান্তিপূর্ণ রাখা এবং সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় গৌহাটিতে বাংলাদেশ মিশন এবং খুলনা ও সিলেটে ভারতীয় মিশন খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা যৌথ ঘোষণার প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দিব।

১৯ চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল ও দু্ই রুটে বাস চলাচলের বিষয়ে চারটি চুক্তিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ১৯টি  চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে এসব চুক্তি সই হয়। এছাড়া বাংলাদেশে ভারতের জীবন বিমা কোম্পানির (এলআইসি) কার্যক্রম শুরুর জন্য বাংলাদেশের বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার (আইডিআরএ) পক্ষ থেকে সম্মতিপত্র হস্তান্ত করা হয়।

৬ চুক্তি ও প্রটোকল

এগুলোর মধ্যে রয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি (নবায়ন), উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকল (নবায়ন), বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) ও ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্টান্ডার্ডসের (বিআইএস) মধ্যে মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা ও ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি বাস চলাচলে দুটি চুক্তি ও প্রটোকল।

১৩ এমওইউ ও আধা সরকারি এমওইউ

এছাড়া ভারত-বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের মধ্যে সমঝোতা, মানবপাচার প্রতিরোধের বিষয়ে, পাচার ও জাল নোটের বিস্তার প্রতিরোধ, ২০০ কোটি ডলারের ভারতীয় নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে সমঝোতা, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ব্লু ইকোনমি ও সমুদ্রসীমা বিষয়ে সমঝোতা এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার নিয়ে সমঝোতা স্মারকে সই হয়েছে।

সমঝোতা চুক্তিগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সার্কের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ভারতীয় সহায়তার (আইইসিসি) অধীনে প্রকল্প, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, ২০১৫-১৭ সালের জন্য সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, বাংলাদেশ-ভারত শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে সম্মতিপত্র।

আখাউরায় ইন্টারনেটের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ ইজারার বিষয়ে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি (বিএসএনএল) ও ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) মধ্যে সমঝোতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও নয়া দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যৌথ উদ্যোগে বঙ্গোপসাগরে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ এবং কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ইন্ডিয়ার মধ্যে আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা কক্ষে বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তি, সমঝোতা ও সম্মতিপত্রগুলো বিনিময় করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়াতুল্লাহ আল মামুন, নৌ-পরিবহন সচিব শফিক আলম মেহেদী, শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, সড়ক পরিবহন সচিব এম এ এন সিদ্দিক, স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন, পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক, পরিবেশ সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ, সংস্কৃতি সচিব আকতারী মমতাজ, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পাবন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানউদ্দিন, বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনওয়ার হোসেন এবং আইডিআরএর চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন।

আর ভারতের পক্ষে হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণ, পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার উপাচার্য ভিসি-তালাত আহমাদ, বিএসএনএলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুপম শ্রীবাস্তব চুক্তি বিনিময় করেন।