আইন কমিশনের অভিমত

বিচার বিভাগের ভঙ্গুর দশা

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৫, ০০:০১
‘দেশের বিচার বিভাগ এখন এক ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে’-এই অভিমত আইন কমিশনের। কমিশন মনে করে, এর ফলে মামলা জট দূর করা তো দূরের ব্যাপার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হবে বিচার বিভাগ। এ প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের উপর নতুন চিন্তায় নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করা জরুরি বলে অভিমত দিয়েছে আইন কমিশন। আইন কমিশনের এক ধারণাপত্রে এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়। এদিকে, বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যাও সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমিশন এই বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করে। দেশের নিম্ন আদালতে ২৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োজিত আছেন মাত্র ১১শ’ জন। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ৪ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৮টি মামলা বিচারাধীন ছিল।
 
হাইকোর্টে বর্তমানে ৯৭জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। বিগত ১৫ বছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও মামলার সংখ্যা কমেনি। ২০০১ সালে জানুয়ারি মাসে হাইকোর্টে বিচারপতি ছিলেন ৫৬ জন। বিপরীতে ১ লাখ ২০ হাজার ২৮০টি মামলা বিচারাধীন ছিল। ২০০৩ সালে বিচারক ছিলেন ৫৭ জন, মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮টি। ২০০৪ সালে বিচারক ছিলেন ৭২ জন, মামলা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৭টি। ২০০৫ সালে ৭২ জন বিচারকের বিপরীতে মামলা দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮১১টি। ২০১০ সালে বিচারক ছিলেন ৯৪ জন, মামলা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৭১টি। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিচারক ছিলেন ৯৭ জন। মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৮টি। ১৫ বছরে হাইকোর্টে মামলা বেড়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮টি।
 
আইন কমিশন মনে করে, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই কেবল মামলার সংখ্যা কমবে না। কমিশন এ ব্যাপারে ১২ দফা করণীয় উপস্থাপন করেছে। মামলা নিষ্পত্তি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি মনিটরিং সেল, রুল ইস্যু না করে কোন আদেশ প্রদান না করা, ৬ মাসের মধ্যে রুল নিষ্পত্তি না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উক্ত রুল খারিজ করা, প্রত্যেকটি মোশন এফিডেভিটের তারিখ ও ক্রম অনুসারে নিষ্পত্তি করাসহ অবকাশকালীন বেঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে এতে।
 
মামলা জটের কারণ হিসেবে বিচারকদের অদক্ষতাও দায়ী বলে মনে করে আইন কমিশন। কমিশনের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ আমলে মুন্সেফ পদে নিয়োগের জন্য আইন পেশায় ৫ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হত। ফলে বিচারপ্রার্থীদের কষ্ট, দুর্ভোগ ও আর্থিক সমস্যা সম্পর্কে ওই আইনজীবীরা পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ডিগ্রি থাকলেই বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যায়।
 
অতীতে বিচারকদের যোগ্যতার উপরই পদোন্নতি নির্ভর করত। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে জেলা পর্যায়ের বিচারকগণ নির্বাহী বিভাগের তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণে থাকতেন। সে সময় পদোন্নতি এবং পদায়নের জন্য তদবির করা হলে অসদাচারণ বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে বিচারকগণ মন্ত্রণালয়ে নানা বিষয়ে তদবির করা আরম্ভ করেন। আইন কমিশন মনে করে, বিচার বিভাগের অবক্ষয় এভাবেই শুরু হয়। বর্তমান অবস্থা আরো ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, পূর্বে জেলা পর্যায়ের বিচারকদের সাথে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের যোগাযোগের কোন সম্ভাবনা ছিল না। বর্তমানে অনেক জেলা পর্যায়ের বিচারক হাইকোর্টের বিচারপতিদের কাছে গিয়ে তদবির করেন। অভিযোগ আছে, অনেক বিচারক বিভিন্ন বিচারাধীন মামলায় কোন কোন বিচারপতিদের নিকট হতে তদবির পান। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা যেন পদোন্নতির মাপকাঠি নয়। কার সাথে কার যোগাযোগ আছে তাই প্রধান। এ কারণে উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত সার্বিকভাবে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি বর্তমানে মোটেও উজ্জ্বল নয়। মানুষের শেষ ভরসা বিচার বিভাগ এক ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এখানে আইনের শাসন প্রয়োগের ব্যর্থতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, আমাদের সংবিধানে ‘গভর্নমেন্ট অব লজ’ প্রবর্তন করেছে, ‘গভর্নমেন্ট অব ম্যান’ নয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, বিচার বিভাগ কখনো এক বা একাধিক ব্যক্তির ইচ্ছের উপর নির্ভর করতে পারে না। কেবল সংবিধান ও আইন বিচার বিভাগকে পরিচালনা করবে।
 

“আদালতে মামলা জট: কারণ ও সমাধানের সন্ধানে” শীর্ষক এক কর্মশালায় আইন কমিশনের পক্ষ থেকে গত শনিবার এই ধারণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়। এতে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ ৫জন সাবেক প্রধান বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন।