দুই সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ব্যয় ৪৯ লাখ, নিম্নে ‘শূন্য’ টাকা

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৫, ১০:২১
 
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সর্বোচ্চ ৪৯ লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন শূন্য টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন প্রার্থীরা। উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক সর্বোচ্চ ৪৯ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। আর দক্ষিণে ল্যাপটপ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জাহিদুর রহমানের মেয়র পদে ভোটে লড়তে একটি পয়সাও খরচ করেননি। তিনি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন ‘শূন্য টাকা’। তবে এবারের দুই সিটিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী ব্যয় হয়েছে।
 
এদিকে, গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব ইসির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান থাকলেও গতকাল সোমবার পর্যন্ত তা প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালার ৫২ উপ-বিধিতে বলা হয়েছে, ‘প্রার্থীর দাখিলকৃত হলফনামা, সম্ভাব্য উেসর বিবরণী, নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন কমিশনের ওয়েবসাইটে জনগণের অবগতির জন্য প্রদর্শিত হবে।’ ৫১ উপ-বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত প্রার্থীর নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিটার্নি অফিসারের কাছে নির্ধারিত ফরমে নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্নি দাখিল করতে হবে। গত ৩০ এপ্রিল তিন সিটি নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশ করে কমিশন। গত ২৯ মে তিন সিটির  মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্তু প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়ার পর ১০ দিন অতিবাহিত হলেও তা এখনো ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচনী কার্যক্রমে প্রার্থীরা বাড়তি ব্যয় করছেন কিনা তা মনিটরিংয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল না ইসির। মাঠে ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিম-এর কার্যক্রম দেখা যায়নি। নির্ধারিত ব্যয়সীমার কয়েক গুণ বেশি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে মেয়র ও কাউন্সির প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

 

দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলম ও মিহির সারওয়ার মোর্শেদ জানান, প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ে ব্যয়সীমার মধ্যেই নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দেখিয়েছেন। তবে তথ্য সঠিক কিনা তা এখনো যাচাই বাছাই করা হয়নি। প্রার্থীদের ব্যয়ের রিটার্নি দ্রুত ওয়েবসাইটে দেয়া হবে বলে জানান তারা। 

 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এবার মেয়র পদে ৩৬ জন এবং কাউন্সিলর পদে আট শতাধিক প্রার্থী ছিলেন। ভোটার সংখ্যার অনুপাতে এবার মেয়র পদের প্রার্থীদের জন্য উত্তরে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং দক্ষিণে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের সুযোগ ছিল। এছাড়া মেয়র পদের প্রার্থীদের ব্যক্তিগত খরচ করতে পারে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা। 

 

উত্তর সিটিতে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় : উত্তর সিটিতে মেয়র পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর চেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় বেশি হয়েছে। এ সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ছিলেন ব্যবসায়ী আনিসুল হক। তিনি ব্যয় করেছেন প্রায় ৪৯ লাখ টাকা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ব্যয় করেছেন সাড়ে ৪৫ লাখ টাকার ওপরে। আনিসুল হক নির্বাচন পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত দু’খাতে ব্যয় করেছেন ৪৯ লাখ ২৩ হাজার ৬২৫ টাকা। তিনি ১০২টি ভাউচারের মাধ্যমে ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ৬২৫ টাকা এবং চারটি চেকের মাধ্যমে ১১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন বলে রিটার্নে উল্লেখ করেছেন। আর ক্ষমতাসীন সমর্থিত এ প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচ হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা, যা রিটার্নে দেখিয়েছেন তিনি। এছাড়া ভোটার তালিকার সিডি কেনা ও ফটোকপিতে ৭৮ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে তিনি মোট ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। বাকি ব্যয় তিনি দেখিয়েছেন-ক্যাম্প স্থাপন, আপ্যায়ন, কর্মী ভাতা, ঘরোয়া বৈঠক, মাইকিং, প্রতীক, হ্যান্ডবিল, স্টিকার, পথসভা, পোস্টার ও লিফলেট বাবদ। জনপ্রতি দৈনিক ৫০০ টাকা করে ১৩ দিন কর্মীদের খরচ দিয়েছেন আনিসুল হক। ৩৬টি ওয়ার্ডের ২৫টি থানায় মাত্র ৫ জন করে কর্মী দেখিয়ে এ বাবদে ৮ লাখ টাকার হিসাব তিনি দেখিয়েছেন।

 

অপরদিকে, বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল নির্বাচন পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ টাকার ওপরে ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে নির্বাচনী ব্যয় ৪৩ লাখ ৬০ হাজার ২৭৩ টাকা এবং ব্যক্তিগত ব্যয় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭০ টাকা। অফিস স্থাপন, ভোটার তালিকার সিডি কেনা, ফেইসবুক প্রচারণার জন্যে ভিডিওগ্রাফি ও মোবাইল এসএমএস বার্তার ব্যয়ের হিসাব তিনি ইসিতে দিয়েছেন। কর্মীদের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি ৭৫ টাকা করে ১৫ দিনে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন তাবিথ। তার দাবি, প্রতিটি ওয়ার্ডে তার কর্মী ছিল ১০ জন করে।

 

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রার্থীদের ব্যয় : ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ১১২ টাকা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ ১৯ লাখ ১৩ হাজার ১৭০ টাকা নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন। এই সিটির স্বতন্ত্র প্রার্থী ল্যাপটপ প্রতীকের মো. জাহিদুর রহমান নির্বাচনে ৯৮৮ ভোট পেলেও তার কোন খরচ হয়নি। অথচ এই সিটিতে সবচেয়ে কম ৩১২ ভোট পেয়েছিলেন বাহরানে সুলতান। তিনিও ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। জাহিদুর রহমান নির্বাচনের আগে তিন লাখ টাকা খরচের সম্ভাব্য হিসাব দিয়েছিলেন। তিনি হলফনামায় বছরের ২ লাখ টাকা আয় দেখালেও নির্বাচনে কোন খরচ না হওয়ার তথ্যে বিস্মিত হয়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা।

 

এ নির্বাচনে লাখ টাকার বেশি ব্যয় দেখিয়েছেন এমন প্রার্থীদের মধ্যে জাপা সমর্থিত হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন ৯ লাখ ৭ হাজার টাকা, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮১০ টাকা, মো. রেজাউল করিম ৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, বজলুর রশীদ ফিরোজ ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬০ টাকা, মো. আবদুল খালেক ১ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ টাকা, মো. আব্দুর রহমান ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩শ টাকা। এছাড়া আবু নাছের মুহাম্মদ মাসুদ হোসাইন ৭৮ হাজার ৬১৬ টাকা, এ এস এম আকরাম ৩৪ হাজার ১০০ টাকা, এডভোকেট মোহাম্মদ আয়ুব হুসেন ১৬ হাজার ৫০০ টাকা, মো. আকতারুজ্জামান ওরফে আয়তুল্লাহ ২৩ হাজার ৭৮০ টাকা, এসএম আসাদুজ্জামান রিপন ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা, দিলীপ ভদ্র ২৮ হাজার ৫০০ টাকা, মশিউর রহমান ১৯ হাজার ৫৯৫ টাকা, মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা, মো. বাহারানে সুলতান ৫০ হাজার টাকা,  মো. শহীদুল ইসলাম ৩৯ হাজার ৫শ টাকা এবং শাহীন খান ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য দিয়েছেন।