বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। খুলে গেছে দুদেশের আস্থা-বিশ্বাসের স্বর্ণের দুয়ার, সম্পর্কের নব দিগন্তের। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে আগামী দিনে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়িত এ দুটি দেশ একসঙ্গে উন্নতির সোপানে যাত্রার পথও খুলে গেছে। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, আর তার কন্যা শেখ হাসিনা এবার জনগণকে উপহার দিলেন দেশের পূর্ণ মানচিত্র।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের পর দুদেশের সম্পর্ক নিয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে সোমবার সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এ সময় তিনি পচাত্তর পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতাসীনদের ভারতের সঙ্গে বৈরিতা, সম্পর্কের অবনতি, বর্তমানে সম্পর্কের সেতুবন্ধন সৃষ্টির দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন।
সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাক্ষাতকার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপির রাজনীতির প্রধান হাতিয়ারই ছিল ভারত বিরোধীতা। ভারত ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মিথ্যাচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করেই এ দলটি অতীতে ক্ষমতায় এসেছিল। এখন সবদিক থেকে পরাজিত হয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ভারতের তোষণ আর নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাতকারের জন্য ধরণা দেওয়ার ঘটনা তাঁর ‘দ্বৈত রাজনীতি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করলেও ওই বৈঠকে নরেন্দ্র মোদী সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ করে তার দেশের মনোভাবের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে নরেন্দ্র মোদী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেশ গণতন্ত্র চায়, কিন্তু মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ কিংবা জঙ্গীবাদকে সমর্থন করে না। নরেন্দ্র মোদীর এই বক্তব্যে শুধু খালেদা জিয়ার প্রতিই নয়, এদেশের সকল জঙ্গিগোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে একটি সুষ্পষ্ট বার্তা।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী সময়কালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এতো উচ্চমাত্রায় কখনো পৌঁছায়নি। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের মধ্যে দিয়ে দুদেশের সম্পর্ক শুধু উচ্চমাত্রায় যায়নি, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সোনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে। ‘ভারত শুধু বাংলাদেশের পাশাপাশি নয়, এক সাথে রয়েছে’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী এ সুষ্পষ্ট বার্তার মাধ্যমে আগামী দিনে দুদেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নতির সোপানে যাত্রা করবে, সেটিই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ভারত আমাদের আকৃত্রিম পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এবং দলমত নির্বিশেষে সে দেশের জনগণ বাংলাদেশকে শুধু সমর্থনই দেননি, লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। সর্বশেষ আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় হাজার হাজার সৈন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভূমিকা রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর অবিস্মরণীয় ভাষণের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতের হাজার হাজার জওয়ানও জীবন দিয়েছে, নিজেদের রক্ত ঝরিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে সহযোগিতা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তের বন্ধনে দুদেশের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘদিন সেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল না।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের সঙ্গে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের মধ্যে শুধু ফাটলই ধরায়নি, খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শাসনামলে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের মাটিতে ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়েছে, ভারতকে অস্থিতিশীল করতে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে ওই সময় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী অপসংস্কৃতিও গড়ে উঠেছিল। এসব কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটাই নাজুক অবস্থায় চলে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পাঁচটি বছর দক্ষভাবে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে আবারো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বাতাবরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন শেখ হাসিনা। কিন্তু ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারো ভারতের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর আঘাত হানা হয়। ভারত বিরোধী নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের মাটিতে আবারো শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে খোদ সরকার থেকে সহযোগিতা করা হয়।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই পরিস্থিতির আবারো পরিবর্তন শুরু হয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সৃষ্ট নাজুক সম্পর্ক পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করার কাজে হাত দেন। দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে এনে একে নিষ্পত্তি করতে থাকেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে স্থাপিত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিগুলো শুধু গুড়িয়েই দেননি, বাংলাদেশের মাটিতে লুকিয়ে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেছেন, অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে ধরে ভারতের কাছে হস্তান্তর পর্যন্ত করা হয়েছে।
১৪ দলের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র বলেন, বন্ধুত্ব ও আস্থার বহির্প্রকাশ ঘটেছে ভারতের লোকসভাতেও। দীর্ঘ ৬২ বছর ধরে ঝুঁলে থাকা বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তিটি লোকসভায় দলমত নির্বিশেষ ভারতের সকল রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে পাস করেছে। এ ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ সরকার নয়, দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যেও ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইতিবাচক আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। এটি দুদেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা উল্লেখ করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ তার দেশের বাংলাদেশের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবই ফুটে উঠেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও নরেন্দ্র মোদীর আবেগঘন বক্তব্যে প্রশংসিত হয়েছে। তার প্রতিটি বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে যে, ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ অভিন্ন নদীর ব্যাপারে ঝুঁলে থাকা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে গেছেন। আমরাও আশাবাদী, খুব দ্রুতই তিস্তার সমস্যাও সমাধান হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে বাংলাদেশ যে আজ সবদিক থেকে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে। শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার কারণেই ভারত ও মায়ানমারের কাছ থেকে বিশাল সমুদ্রসীমা আমরা অর্জন করেছি। সমুদ্রে আরেকটি বাংলাদেশের সমপরিমাণ জলরাশির ওপর আমাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
