সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, মণিপুরের চা্লেল ও নাগাল্যান্ডের তুয়েনসাং জেলার লাগোয়া মায়ানমার সীমান্তে ঢুকে অভিযান চালায় কম্যান্ডো বাহিনী। সেনার ‘টার্গেট’ ছিল নোকলাকের ওনজায় জঙ্গিদের দু’টি শিবির। সেখানে খাপলাং, কেসিপি, কেওয়াইকেএল সংগঠনের শতাধিক জঙ্গি থাকার খবর মিলেছিল। দু’টি এমআই ১৭ হেলিকপ্টার নিয়ে ২১ প্যারা কম্যান্ডো বাহিনী আচমকা হামলা চালায়। পাল্টা জবাব দেওয়ার সময় পায়নি জঙ্গিরা। সেনার প্রাথমিক হিসেবে, নিহতের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি হতে পারে। তবে এই সংখ্যা শতাধিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মঙ্গলবার রাত তিনটায় অভিযান চালানো হয়। এরপর বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযানের সমাপ্তি টানা হয়। তবে সেনাবাহিনী সূত্র জানিয়েছে, মূল অভিযান ছিল মাত্র ৪৫ মিনিটের। মিয়ানমার সীমান্তে ঢুকে হামলার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান ভারতের তথ্য প্রতিমন্ত্রী কর্নেল রাজ্যবর্ধন সিংহ রাঠৌর। তিনি বলেন, জঙ্গিরা মিয়ানমারে ঘাঁটি গেড়ে ভারতে নাশকতা চালিয়ে যাবে সহ্য করা হবে না। যে কোনো দেশে যে কোনো স্থানে হামলা চালানো হবে।
অভিযানের পরিকল্পনা হয় পাঁচ দিন আগে Åপ্রধানমন্ত্রী মোদীর নির্দেশেই অভিযান Åঅভিযান ছিল ৪৫ মিনিটের Åহুমকি থাকলে ভারত যে কোনো স্থানে অভিযান চালাবে :তথ্যপ্রতিমন্ত্রী
মিয়ানমার সীমান্তে নাগা বিদ্রোহীদের (খাপলাং) দমনে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশটির ভেতরে প্রবেশ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানে শতাধিক বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার মাত্র ৪৫ মিনিট ধরে এই অভিযান চালানো হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং এই অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেশটির কেন্দ্রীয় তথ্য ও সমপ্রচার প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, জঙ্গি হুমকি থাকলে ভারত যে কোনো দেশের যে কোনো স্থানে অভিযান চালাতে পারে। তার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পাকিস্তান মিয়ানমার নয়। এদিকে চীন জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের কোনো সম্পর্ক নেই। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজার পত্রিকার।
সেনা হত্যার প্রতিবাদে অভিযান :
গত সপ্তাহে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যে সেনাবাহিনীর একটি গাড়িবহরে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হামলায় ২০ সেনা সদস্য নিহতের ঘটনার জবাবে এ অভিযান চালানো হয়। সীমান্তের ওপারে নোকলাকে এনএসসিএন’র (খাপলাং) একটি ঘাঁটি এবং মণিপুরের উখরুল জেলার সীমান্ত বরাবর কেওয়াইকেএলের একটি ঘাঁটিতে এ অভিযান চালানো হয়েছে। বিশেষ বাহিনী হিসেবে পরিচিত ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর প্যারা রেজিমেন্টের সৈন্যরা এই অভিযান চালায় বলে বিশ্বস্ত কয়েকটি সূত্র জানায়। মিয়ানমার সীমান্তে সম্ভবত এটাই প্রথম অভিযান বলেও জানান তারা।
অভিযানে সাহায্য করেছে খোদ এনএসসিএন (খাপলং)-এর বিদ্রোহী জঙ্গিরা। ৭ জঙ্গির দেহ উদ্ধার হলেও বাকি দেহগুলোর খোঁজ চলছে। সীমান্তের ওপারে জঙ্গিদের অস্ত্র তৈরির কারখানাও ভারতীয়রা সেনারা ধ্বংস করে দিয়েছে। কয়েকদিন আগে মণিপুরের চান্ডেল জেলায় অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ভারতীয় সিংডোগরা রেজিমেন্টের ২০ জওয়ানকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা। ঘটনার পরপরই হামলার দায় স্বীকার করে নাগা জঙ্গিগোষ্ঠী এনএসসিএন (খাপলাং)। আরও দুই বিদ্রোহীগোষ্ঠী কাংলেই ইয়াওল কান্না লুপ এবং কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিলে যৌথভাবে ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা দাবি করে।
অভিযানের পরিকল্পনা ৫ দিন আগে :
এই অভিযানের পরিকল্পনা নেয়া হয় ৫ দিন আগে। এ কারণে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরসঙ্গী হননি। তিনি মণিপুরে চলে যান। এজন্য সেনাপ্রধান জেনারেল দলবির সিং সুহাগও তার যুক্তরাজ্য সফর বাতিল করেন। তিনিও চলে যান মনিপুরে। সেখানে তিনি কোর-৩ এর কম্যান্ডার ও আসাম রাইফেল্স কর্তাদের সঙ্গে মঙ্গলবারের হামলা নিয়ে প্রাথমিক বৈঠক করেন। সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অনুমতি পাওয়ার পরই ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের ২১ প্যারা কম্যান্ডোরা হামলার প্রস্তুতি শুরু করেন। তাদের সাহায্যে তৈরি ছিল আসাম রাইফেলস্। মিয়ানমার সরকারের শীর্ষ মহলে হামলার খবর জানাতে হত। কিন্তু সেই দেশের সেনাবাহিনীকে সরকারিভাবে আগে ওই তথ্য জানাতে চায়নি ভারতীয় সেনাবাহিনী। তাতে খবর ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা ছিল। অভিযানের কয়েক মিনিট আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে জানানো হয়। এতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও নজরে রাখা হয়। উল্লেখ্য, ভারত এবং মিয়ানমার ২০১০ সালে সীমান্তে বিদ্রোহীদের দমনে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। মণিপুরে সেনা কনভয়ে জঙ্গি হামলার তদন্ত শুরুর পর জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ জানিয়েছিল, হামলার ষড়যন্ত্র করেছিল তিনজন। খাপলাং বাহিনীর প্রধান খাপলাং, দলের সাধারণ সম্পাদক মুলাতনু এবং প্রচার সম্পাদক চাকেসাং। সেই বিবৃতি দিয়ে বিভিন্ন পক্ষ প্রশ্ন তোলেন। খাপলাং এর এক সময়ের ঘনিষ্ট ওই দুই নেতা যে গত বছরই জঙ্গি শিবির ছেড়ে সংঘর্ষে বিরতি টেনেছেন। সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, মূলত খাপলাং জঙ্গিদের বিভ্রান্ত করতেই ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল।
সংঘর্ষ বিরতিতে থাকা জঙ্গিদের কাছ থেকে মিয়ানমারের খাপলাং বাহিনীর ঘাঁটির মানচিত্র বুঝে নিয়েছিলেন কম্যান্ডোরা। মায়ানমার সীমান্তের ও পারে সে দেশের সেনা বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কার্যত কোনও অস্তিত্ব নেই। সেখানে অনেকটা এলাকায় খাপলাং-এর স্বশাসন চলছে। সেনাকর্তারা খবর পেয়েছিলেন, মণিপুরে হামলায় জড়িত জঙ্গিদের মঙ্গলবার মিয়ানমার সীমান্তের জঙ্গলের ঘাঁটিতে সংবর্ধনা দেয়া হবে। সেখানে হাজির থাকবেন খাপলাং বাহিনীর সেনাপ্রধান ইসাক সুমি, অর্থমন্ত্রী স্টারসন, কেসিপি সভাপতি কে লাবা মেইতেই এবং কেওয়াইকেএল চেয়ারম্যান এন ওকেন। সেখানেই হামলার ছক ছিল সেনাবাহিনীর। কিন্তু ওনজা ও চাসাডের অন্য দু’টি জঙ্গিশিবিরে হানা দিলেও, জঙ্গিদের সংবর্ধনা সভায় সম্ভবত পৌঁছতে পারেননি কম্যান্ডোরা। ওই সেনাকর্তারা জানান ‘‘পুরো অভিযান দ্রুত শেষ করতে হয়েছে। তাই মিয়ানমার সীমান্তের ওদিকে বেশি ভিতরে ঢোকার সময় হয়নি।’’
যেভাবে অভিযান :
