উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় প্রতিবছরই বাড়ছে অনুন্নয়ন ব্যয়। সরকারের বেতন-ভাতা খাতে চলে যাচ্ছে বাজেট বরাদ্দের সিংহভাগ। সে হারে বাড়ছে না উন্নয়ন ব্যয়। বরাবরের মতোই এটি হয়ে আসছে। আগামী অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ আরো বাড়ানো হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ‘অন্যান্য ব্যয়’ হিসাবে নিলে এই বরাদ্দের মোট আকার দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, বাজেটের দুটি অংশের একটি উন্নয়ন বাজেট। অপরটি অনুন্নয়ন রাজস্ব বাজেট। উন্নয়ন বাজেটে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দেয়া বরাদ্দের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। অনুন্নয়ন বাজেটে মূলত সরকারের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা খরচের হিসাব থাকে। অনুন্নয়ন বাজেটের প্রধান অংশটি ব্যয় হয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাদি বাবদ। এ খাতের আরেকটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধ খাতে।
বাজেট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—বিগত ২০১০-১১ সালে মোট বাজেটের ২৯ শতাংশ অর্থাত্ ৩৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা ছিল উন্নয়ন ব্যয়। অপর দিকে, অনুন্নয়ন ব্যয় ছিল ৮৩ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। আগামী (২০১৫-১৬) অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। যেখানে উন্নয়ন ব্যয়ের আকার দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা টাকা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়—২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রকৃত বাজেট ১ লাখ ২১ হাজার ৮ কোটি টাকা থেকে ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে অনুন্নয়ন ব্যয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সংশোধিত ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা পরবর্তীতে ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৯৯ কোটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্য দিকে, সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে উন্নয়নব্যয় বৃদ্ধির শ্লথ হার লক্ষণীয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের উন্নয়ন খাতে প্রকৃত বরাদ্দ ৫৯ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ থেকে ৩৬ দশমিক শুন্য ৫ শতাংশ বেড়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ৮০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি করে বাজেটে ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থপ্রবাহ বাড়ে। যদিও উন্নয়ন বাজেটের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহূত না হওয়ার অভিযোগ পুরনো।
এ দিকে, প্রতিবছরই বাজেটের একটা বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। এবার তা আরো বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ১০৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে নেয়া ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৩৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, বাকি ১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা বৈদেশিক উত্স থেকে নেয়া ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করা হবে। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে (সংশোধিত বাজেটে) ২৯ হাজার ৮৬৫ টাকা।
জিডিপির হারে ব্যায়:
প্রতিবছর টাকার অংকে বাজেট বাড়ছে। সেই সাথে সবখাতেই বরাদ্দ বাড়ছে। কিন্তু মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) তুলনায় উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা—যায়, ২০১২-২১৩ হতে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে জিডিপির তুলনায় যথাক্রমে ৯.২৩ শতাংশ, ১০.০৪ শতাংশ এবং ১০.১৯ শতাংশ। অন্য দিকে, উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে জিডিপির তুলনায় যথাক্রমে মাত্র ৪.৮২ শতাংশ, ৪.৮৫ শতাংশ এবং ৫.৭০ শতাংশ।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগের ক্রমহ্রাসমান পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.০৩ শতাংশ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২২.০৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
অন্য দিকে, সরকারি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান হার বাড়ছে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট জিডিপির ৬.৫৫ শতাংশ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬.৯০ শতাংশ হয়।
