জামায়াত নিয়ে বিভক্ত বিএনপি

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৫, ১১:২৭

দীর্ঘদিনের জোট মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ নিয়ে বিএনপিতে বিভাজন এখন অনেকটা প্রকাশ্য। জামায়াত প্রশ্নে বিএনপিতে অস্বস্তি আগে থেকে চলে আসলেও সমপ্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকের পর তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

 
বিএনপির প্রগতিশীল এবং মধ্যপন্থীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এক পক্ষ চাচ্ছে জামায়াতকে ছেড়ে দিতে আর অপর পক্ষ চায় কাছে রাখতে। একটি অংশ মনে করছে জামায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির জনপ্রিয়তা হ্রাস হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাধীনতা বিরোধিতার কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিরূপ মনোভাব রয়েছে। আর আন্তর্জাতিক মহলেও জামায়াতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
 
দলের অপর অংশটির নেতারা জামায়াতের প্রতি একেবারে দুর্বল বা বৈরিতা না দেখিয়ে কৌশলগত সম্পর্ক রেখে দলটির জনসমর্থন আন্দোলন ও নির্বাচনে ব্যবহারের পক্ষপাতী। দায়িত্বশীল কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, এ নিয়ে দোটানায় আছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং জোট প্রধান বেগম খালেদা জিয়া।
 
অবশ্য বিএনপি হাইকমান্ড জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা দোষণীয় মনে করছেন না। এই পটভূমিতে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন বাড়লেও আপাতত কেউ কাউকে ছাড়ছে না। আপাতত জামায়াত ২০ দলীয় জোটেই থাকছে। জামায়াতের জোটে থাকা না থাকা বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মহলের প্রশ্নের মুখে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘সময় আসলে জোটে তাদের থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকলেও সেটা কোনো আদর্শিক জোট নয়।’
 
এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জামায়াত যদি জঙ্গি সংগঠন হতো, তাহলে তো সরকার নিষিদ্ধ করত। আমরা তো জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছি আন্দোলন এবং নির্বাচনের জন্য। তাদের সঙ্গে আদর্শগত কোন সম্পর্ক আমাদের নেই। আমাদের আদর্শ আলাদা। তাদেরটা তাদের মতো।’
 
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট মূলত আন্দোলন এবং নির্বাচন কেন্দ্রিক। এক সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেছিলো জামায়াত। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ জামায়াতকে বিএনপির জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য জোরাজুরি করছে। ২০ দলীয় জোটে তো আরো দল আছে তাদের ব্যাপারে কেন কথা বলে না? বিএনপি জামায়াতকে ছাড়বে কিনা এখনই এটা বলা যাবে না, সময়ই বলে দেবে কী করতে হবে।
 
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান বলেন, জামায়াতের থাকা না থাকার বিষয়টি তাদের ব্যাপার। বিএনপি তাদেরকে বাদ দিবে না।
 
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর ২৮ মে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতকে বাদ দেয়াসহ জোট ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখন আর ২০ দলীয় জোটের প্রয়োজন নেই। কারণ যেসব জেলায় জোটের শরিক দলের আসন রয়েছে, সেসব জেলায় বিএনপির নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। তাই জোট ভেঙে দিয়ে তাদের বিএনপিতে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব রাখছি।’
 
সমপ্রতি ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া বহুল আলোচিত ’টেলিফোন স্ক্যান্ডালে’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের টেলিফোনে জামায়াত ছাড়ার বিষয় আলাপ হয়। সেখানে আবেদ বলেন, জামায়াত ছাড়ার কথা বলেন। সেটা না ছাড়লে দেশে আর বিএনপি থাকবে না। এ ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। এর উত্তরে মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, ’কথা ঠিক।’
 
এদিকে গতকাল বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও দলটির বর্তমান মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে বহির্বিশ্বের কোনো চাপ নেই। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ভোটের। এ জোট সম্পূর্ণ কৌশলগত এবং সময়ের বাস্তবতা। বৃষ্টি হলে যেমন ছাতা নিতেই হয়। জোটে আন্দালিব রহমান পার্থের বিজেপিও আছে। সাম্যবাদী দলও আছে। তারা তাদের রাজনীতি করে। আর বিএনপি জিয়াউর রহমানের দর্শনের রাজনীতি করে। সবাই যার যার মতো আলাদা।
 
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ‘খালেদা জিয়ার বিএনপি এখন জামায়াত নির্ভর’ এ মন্তব্যের প্রেক্ষিতে রিপন বলেন, তিনি আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন। তিনি আরেকটি দল করলেও তার দর্শনও জিয়াউর রহমানের আদর্শ। ওই মন্তব্য তার একান্তই ব্যক্তিগত। তবে বিএনপি জামায়াত নির্ভর দল নয়। বিএনপি জিয়াউর রহমানের দর্শন ও মূলনীতি দিয়ে পরিচালিত হয়।
 
আসাদুজ্জামান রিপন সাংবাদিকদের বলেন, আগে থেকেই জামায়াতকে নিয়ে বিএনপিতে অস্বস্তি বা ভিন্নমত আছে। বিশেষ করে গত আন্দোলনে দলটির ভূমিকায় নেতা-কর্মীরা অসন্তুষ্ট।
 
গত শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার আহ্বান জানান। বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, বিএনপি এখন জিয়াউর রহমানের আদর্শের মধ্যে নেই। দলটির রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ জামায়াত নির্ভর। বিএনপির বাঁচতে হলে জামায়াত নির্ভরতা ছেড়ে আবারো জিয়ার আদর্শে ফিরে আসতে হবে। দেশে-বিদেশে যে চাপ তাতে এই রাজনীতি টিকবে না।
 
জাতীয় পার্টি-বিজেপি সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আমাদের রাজনীতি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। জামায়াত দাবি করে তারা ইসলামিক দল। আগের মতো এসব ইসলামী দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অবস্থান নেই। বিএনপি যদি জামায়াতকে ছেড়ে দেয়, সে ক্ষেত্রে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ ২০ দলের সবারই জোট হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। এখানে যদি জামায়াতকে জোট থেকে বিএনপি বের করে দেয়, তাহলে ১৯ দলীয় জোট হবে। কারণ ২০০১ সালের রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট আর বর্তমান এক নয়। জনপ্রিয়তা থাকলেই হবে না, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থনসহ আরও বেশকিছু উপাদান থাকতে হবে।
 
এদিকে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, জনগণের ভোটাধিকার বহাল ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারসহ জাতীয় প্রয়োজনে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল। জোটের শরিক সকল দলেরই নিজস্ব আদর্শ ও কর্মসূচি রয়েছে। কাজেই এখানে এক দলের ওপর অন্য দলের নির্ভরশীলতার প্রশ্ন সম্পূর্ণ অবান্তর।
 
প্রসঙ্গত যে, আন্তর্জাতিক মহলে জামায়াতকে নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ। গত বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার কথা বলে। এই সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সুনাম আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সেই সুনাম ধরে রাখা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার সংস্কৃতি বৃদ্ধি করা। বিএনপির উচিত জামায়াতে ইসলাম এবং হেফাজতে ইসলাম থেকে নিজেদের দূরে রাখা।
 

সমপ্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের সময়েও জামায়াত নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল বিএনপি। নরেন্দ্র মোদীর সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয় শঙ্কর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ভারত গণতন্ত্রের পক্ষে, জঙ্গিবাদের বিপক্ষে। তার ওই বক্তব্যও জামায়াত বিষয়ে একটি ইঙ্গিত ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।