আবারো বাড়তি আর্থিক চাপ পড়তে যাচ্ছেন ইংলিশ মিডিয়ামে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। আগের চেয়ে এখন টিউশন ফি প্রায় দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। ইতিমধ্যে টিউশন ফি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রযোজ্য রয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ কর ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু ইংলিশ মাধ্যম স্কুলে নয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোকেও এই ১০ শতাংশ করের আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, আরোপিত কর সবসময় ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। আর এই বাড়তি আরোপিত কর শিক্ষার্থীর অভিভাবককেই বহন করতে হবে, যেটা অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকরও করেছে। ৭.৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ করায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর বেতন বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট প্রস্তাব কার্যকর হলে বেসরকারি খাতে শিক্ষাব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বসালে তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বেতন, টিউশন ফিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি বাড়িয়ে দেবে। এতে করের বোঝা এসে পড়বে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের ওপর। অভিভাবকরা বলছেন, এখন বিত্তশালীর সন্তানরাই শুধু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে না। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। কষ্ট করে হলেও নিজের উপার্জনটুকু সন্তানের ভবিষ্যত্ গড়ার পিছনে ব্যয় করতে চান তারা। একদিকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্রতিবছর টিউশনসহ অন্যান্য ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার প্রতি বছর এসব স্কুলের ওপর কর আরোপ করছে। এতে অভিভাবকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে এমন এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রফিকুল আলম বলেন, শিক্ষা কোন ব্যবসা নয়। আর কর আরোপ করা হয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকেই। অথচ সরকার শিক্ষার ওপর কর আরোপ করে শিক্ষাকে ব্যবসায় পরিণত করছে। আমাদের প্রত্যাশা, এভাবে কর আরোপ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে না সরকার।
সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বাজেটে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর পর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপ করে। পরে গত অর্থবছরে এটি বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। বর্তমান অর্থমন্ত্রী চলতি মাসে ঘোষিত বাজেটে ১০ শতাংশ করের প্রস্তাব করেন।
আলমগীর হোসেন নামে এক অভিভাবক বলেন, সাধারণত অন্যান্য শিক্ষার চেয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে টিউশনসহ অন্যান্য ফি বেশি। এরপর নতুন করে বাড়তি কর আরোপ করা হলে অভিভাবকদের আন্দোলন করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাবেন তাদেরকে এবার বাধ্যতামূলকভাবে করের আওতায় আনা হয়েছে। যেসব ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবকদের কর শনাক্তকারী নম্বর (টিআইএন) থাকবে তারাই কেবল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করতে পারবে। এটা কার্যকর হলে যাদের টিআইএন নেই তাদের সন্তানরা আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করাতে পারবেন না।
দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিগুণের বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৬১ শতাংশ। সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সহজলভ্য হলেও, আসন সংখ্যা সীমিত। তাই বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের যেতে হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে চার বছর মেয়াদি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে খরচ করতে হয় ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। মধ্যবিত্ত ঘরের বাবা-মাকে মাথার গাম পায়ে ফেলেই সন্তানদের জন্য এই টাকা জোগাড় করতে হয়। তারপরও চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তো আছেই। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
ইতিমধ্যে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এই ১০ শতাংশ কর শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায়ের নোটিস জারি করেছে। গত ১১ জুন ডেফোডিল ইউনিভার্সিটির জারিকরা নোটিসের শেষ অংশে বলা হয়,...এমতাবস্থায় সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ছাত্র-ছাত্রীকে ৪ জুন, ২০১৫ থেকে ফি প্রদানের সময় নির্ধারিত হারে ভ্যাট প্রদান করে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইম ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মীর শাহাব উদ্দীন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকা অনুদান/বরাদ্দ দেয়া হয়, যা শিক্ষার্থীদের পিছনেই ব্যয় হয়। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এভাবে কর নেয়া হচ্ছে। এটা এক ধরনের বৈষম্য মনে করি।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি অধ্যাপক গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়। শিক্ষাকে সবসময় বাণিজ্যিক রূপ দেয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। এই বাড়তি করের চাপ কিন্তু পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই চাপবে। বিষয়টা নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত হবে না।
বেসরকারি মেডিক্যালে পড়ছেন এমন এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমিনুর রহমান বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে বর্তমানে আসন সংখ্যা সাত হাজারেরও বেশি। ভর্তির সময় ছাত্রপ্রতি টিউশন ফি হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সাধারণ হিসেবে দেখা যায়, শুধু টিউশন ফির টাকার ১০ শতাংশ হারে প্রতি ছাত্রের মূসকের টাকার অংক দাঁড়ায় দেড় লাখ টাকা। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এভাবে বাড়তি চাপ অভিভাবকরা কিভাবে সহ্য করবে।
