বিহারী ক্যাম্প ট্র্যাজেডির এক বছর

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৫, ০২:১৭

‘আমাদের ওপর কেন এমন হামলা করা হলো? কেনই বা আমাকে এতিম করা হলো? আমার কি-ই বা অপরাধ ছিল?’ নতুন কাউকে দেখলেই এমন প্রশ্ন করছে কিশোরী ফারজানা বেগম। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে দূর সম্পর্কীয় বোনের টিনশেড ঘরে এখন আশ্রয় নিয়েছে সে। ২০১৪ সালের ১৪ জুন ভোরে পল্লবীর কালশীতে বিহারী পল্লীতে বিহারী-বাঙালি সংঘর্ষ চলাকালে তাদের ঘরে আগুন দেয়া হলে মা, ভাই-বোনসহ তার পরিবারের ৯ জন নিহত হয়। ঘটনার আড়াই মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর এক রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ফারাজানার বাবা ইয়াসিন। ঘটনার এক বছর পরও এসব ঘটনায় দায়ের করা ৬টি মামলার এখনও কোন কূল কিনারা হয়নি। চিহ্নিত বা গ্রেফতার করা যায়নি হামলাকারীদের।  ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর নিবারণ চন্দ্র বলেন, ৬টি মামলার মধ্যে একটি হত্যা মামলা। পল্লবী থানার এসআই মমিনুর রহমান বাদি হয়ে মামলাটি করেন। এ মামলায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হলেও সকলেই জামিনে রয়েছেন। মামলায় এ পর্যন্ত ৪০ জনের সাক্ষী নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে মারা যাওয়ার আগে ফারজানার বাবা ইয়াসিন পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন।

 
ঘটনার দিন ঐ ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা দেয়া ছিল-এটি বিহারী পল্লীর অনেকেই দেখেছিলেন। এ ব্যাপারে ডিবির ঐ তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলা ডিবিতে আসার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঐ ঘরের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনার দিন অগ্নিকাণ্ডের পর হামলাকারীরা ঘরটি ভেঙ্গে দেয়। এতে ঘরের বাইরে থেকে তালা দেয়ার বিষয়টির কোন প্রমাণ মিলেনি। এ কারণে এই হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আরো কয়েকজন সাক্ষী খোঁজা হচ্ছে।
 
গতকাল শনিবার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে গেলে ফারজানা অভিযোগ করেন, যারা তার পরিবারের ৯ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, তারাই তার বাবা ইয়াসিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। তার বাবা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলেই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
 
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পল্লবীর কালশী বিহারী ক্যাম্পে পুড়ে যাওয়া স্থানটিতে ‘কোরআন সুন্নাহ নুরানী হাফেজিয়া মাদ াসা ও এতিমখানা লিল্লাহ বোডিং’ নামে একটি এক তলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ঐ মাদ্রাসায় বিহারীদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করছে। ঘটনার এক বছর পরও ক্যাম্প এলাকা জুড়ে নিস্তব্ধতা। নতুন মুখ দেখলেই থমকে দাঁড়াচ্ছেন অনেকেই। অজানা আতঙ্ক, হতাশা নিয়ে দিন যাপন করছেন সবাই।
 
পুড়ে যাওয়া ঘরগুলোর দক্ষিণ পাশে গড়ে ওঠেছে আনোয়ার মিয়ার দোকান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত এক বছরে কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। আগুনে আহত বৃদ্ধা মুন্নি বেগম জানান, ‘আল্লাহ বাঁচাইয়া রেখে আমাদের ভুল করেছেন। আমাদের ছেলে- মেয়েরা সব সময় থাকে আতঙ্ক নিয়ে। এবারের শবে বরাতে আমাদের এলাকায় কোনও বিদ্যুতের আলো জ্বালাতে দেয়নি পুলিশ। প্রত্যেকের ঘর ছিলো অন্ধকার। আমাদের নামাজেও বাধা দিয়েছে পুলিশ।’
 
নিহত ইয়াসিনের মামাতো বোনের স্বামী জাহাঙ্গীর বলেন, ৯ জনের লাশ কবর দেয়ার সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। এরপর আর কোনও খবর রাখেনি সরকার। ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রত্যেককে ৪০ হাজার করে টাকা অনুদান হিসেবে দেয়া হয়। এরপর বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ১৫ হাজার করে।
 
এই হামলার অন্যতম উস্কানিদাতা ও নেতৃত্বদানকারী হিসাবে বারবার এসেছে পল্লবী থানা যুবলীগের এক নেতার নাম। ঘটনার পর গা ঢাকা দিলেও এখন প্রকাশ্যেই ঘুরছেন তিনি। গত ডিসিসি’র নির্বাচনে ৫নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেন তিনি। ক্যাম্প বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই যুবলীগ নেতা স্থানীয় সংসদ সদস্যর লোক। তাই তাকে কেউ সাহস করে কিছু বলতে পারে না। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশের ঐ কথাগুলো সব সাজানো নাটক ছিল।
 

কর্মসূচি: বিহারিদের সংগঠন স্ট্র্যানডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপেট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজেআরসি) সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন পাশা বলেন, বিহারিকে হত্যার প্রতিবাদে আজ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এখানেও মানববন্ধন করবেন তারা।