রনির গুলিতেই জোড়া খুন

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৫, ২৩:৩৯

রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে জোড়া খুনের মামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) ও সংরক্ষিত আসনের এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির বন্ধু কামাল মাহমুদ সাক্ষী হিসাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার সময় রনির সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন কামাল মাহমুদ। আদালত সূত্রে এ খবর পাওয়া গেছে।

 
গতকাল বুধবার কামাল মাহমুদ আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে চাইলে ঢাকার মহানগর হাকিম আমিনুল হক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। এর আগে মঙ্গলবার একই বিচারক রনির জামিন আবেদন নাকচ করেন। চার দিনের রিমান্ড শেষে গত ১৩ জুন রনিকে কারাগারে পাঠানো হয়। আগামি এক জুলাই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। 
 
গত ১৩ এপ্রিল মধ্যরাতে নিউ ইস্কাটনে মদ্যপ অবস্থায় রনি তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়লে দৈনিক জনকণ্ঠের অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে ১৫ এপ্রিল রাতে অজ্ঞাত আসামিদের নামে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। গোয়েন্দা পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখে গাড়িটি শনাক্ত করে। পরে প্রথমে গাড়িচালক ইমরান ফকির ও পরে গুলিবর্ষণকারী এমপিপুত্র রনিকে ধানমন্ডির চার নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। ইমরান ফকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও রনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিলে তিনি অসুস্থতার ভান করেন। পরে তাকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা দিয়ে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রনি যানজটে বিরক্ত হয়ে গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেন।
 
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার সময় বখতিয়ারের গাড়ির পেছনের আসনে কামালসহ আরো দুই বন্ধু ছিলেন। পুলিশ তাদের মধ্যে গতকাল কামালকে আটক করে। কামাল সাক্ষী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে সম্মত হলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
 
স্বীকারোক্তিতে কামাল বলেন, ঘটনার রাতে তারা একসঙ্গে প্রথমে বাংলামোটরের শ্যালে বারে যান। এরপর হোটেল সোনারগাঁওয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর বখতিয়ারের গাড়িতে করে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন তারা। জাহাঙ্গীর নামে একজনকে মগবাজার এলাকায় নামিয়ে দিয়ে গিয়ে জনকণ্ঠ ভবনের কাছাকাছি স্থানে যানজটে আটকা পড়েন তারা। এসময় হঠাত্ করেই পিস্তল বের করে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করেন রনি। পরে মগবাজারে জাহাঙ্গীরকে নামিয়ে দিয়ে তারা হাতিরপুল এলাকায় যান। সেখানে তিনি গাড়ি থেকে নেমে গেলে রনি তার বাসায় চলে যান।
 
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, ঘটনার সময় বখতিয়ার যে গাড়িতে ছিলেন, সেই গাড়িটি গত রবিবার বিকালে জব্দ করা হয়েছে। এটি তার মা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি পিনু খানের গাড়ি। পুলিশ তার পিস্তলের লাইসেন্স বাতিলের আবেদনের পাশাপাশি সেটি জব্দ করে ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে।
 
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, রনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দিলেও বস্তুগত প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। পিস্তলটি ব্যালাস্টিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট আসলে বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যাবে। আগামী দু-একদিনের মাথায় পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 
বিপর্যয়ে বিচলিত ছিলেন না রনি:
 
সম্প্রতি আসামি রনির জীবনেও ঘটে গেছে দুঃখজনক ঘটনা। গত ১৩ এপ্রিল বেপরোয়া হয়ে গুলি ছোঁড়ার মাত্র দুইদিন পর ১৫ এপ্রিল রাজধানীর এ্যাপলো হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছে তার ৪০ দিন বয়সের সন্তান রুকসানা। গত ৩ এপ্রিল রুকসানাকে ঐ হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়েছিল। ঘটনার দিনও হাসপাতালে সংকটাপন্ন ছিল  রনির সন্তান। শুধু তাই নয়, দেড় বছর আগে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর রনির আরেক সন্তানও মারা গেছে। তবে নয় বছরের সংসার জীবনে রনির সাড়ে তিন বছর বয়সের একটি মেয়ে আছে।
 

ব্যক্তিগত জীবনে ফুর্তিতে মেতে থাকা রনিকে এসব দুঃখকষ্ট স্পর্শ করে না। তাই নবজাতক কন্যাসন্তানকে আইসিইউতে রেখেও ডিজে পার্টিতে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। মা পিনু খানের রাজনৈতিক প্রভাবেই নিজের আখের গুছিয়েছেন রনি। তার নিজস্ব ব্যবসা বলতে আছে শুধু একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। ‘পিসিপ্যান ইন্সট্রাকশন’ নামের প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় ১৮/১ নয়াপল্টনে। বছরখানেক আগে বনানীতে একটি রেস্টুরেন্ট ও বার চালু করেন তিনি। তবে সরকারদলীয় এক প্রভাবশালী নেতার ছেলের তোপে তিনি সেই ব্যবসা গুটিয়ে নেন।