অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চিঠি দিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিচারক স্বল্পতা, এজলাস সংকট, ভৌত অবকাঠামো ও লজিস্টিক বিষয়াদির অপ্রতুলতাসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত বিচার বিভাগ জনগণের ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ও মানবাধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ, দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা পালনে পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে জনগণের আস্থা ও ভরসার জায়গায় হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে যা রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভারসাম্যকে দুর্বল করে।
২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক নতুন বিচারক নিয়োগ এবং আইন কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত বরাদ্দ অন্তর্ভুক্তকরণে অর্থমন্ত্রীকে দেয়া চিঠিতে বিচারপতি খায়রুল হক এসব কথা বলেন।
চিঠি লিখার বিষয়ে জানতে চাইলে বিচারপতি খায়রুল হক ইত্তেফাককে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ থেকেই চিঠিটি লিখেছি। কারন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার লোকের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৬৭ হাজারের বিপরীতে বিচারক রয়েছেন একজন। ভারত এখন এই সংখ্যা ২০ হাজারে নামিয়ে আনার টার্গেট করেছে। আর আমাদের দেশে ৯৫ হাজার লোকের বিপরীতে রয়েছেন একজন। এই সংখ্যা ৪০ হাজারে নামিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করা উচিত আমাদের।
চিঠিতে বলা হয়, বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহিত করতে হলে একটি আস্থাশীল, কার্যকর ও গতিময় বিচার বিভাগ দেশের টেকসই ও স্থিতিশীল উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ প্রয়োজন। এজন্য বাজেটে আইনের শাসন, মামলার জট ক্রমান্বয়ে লাঘবের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণসহ বিচার বিভাগ সংক্রান্ত আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির প্রতি দৃষ্টিপাত অতীব প্রয়োজন বলে মনে করে আইন কমিশন। বলা হয়, প্রতিবছর মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বাড়ছে।
কিন্তু বিচার বিভাগের নতুন কোন পদ সৃজন করা হচ্ছে না। নিয়োগ পর্যায় হতে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে পরিপূর্ণ একজন বিচারক হিসাবে আদালতে কাজ শুরু করতে কমপক্ষে তিন বছর সময় প্রয়োজন হয়। ইতোমধ্যে নতুন মামলা দায়ের থেমে থাকবে না, বরং ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকবে। অধিক সংখ্যক বিচারক নিয়োগে এই সমস্যার প্রধান সমাধান। এ লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর অন্তত ২০০ জন করে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া জনস্বার্থে জরুরি। ফলে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে নতুন বিচারকরা দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারবেন। এতে মামলা জটের ক্রমবৃদ্ধি কিছুটা হলেও হ্রাস প্রতিক্রিয়ার সূচনা করবে। অন্তর্বর্তী সমাধান হিসাবে বিচার কর্মবিভাগ হতে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের মধ্য হতে দক্ষ, সত্ ও যোগ্য কর্মকর্তাদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। নতুবা মামলা-মোকদ্দমার জট বৃদ্ধির প্রবণতা কোনভাবেই নিম্নগামী করা যাবে না।
চিঠিতে আরো বলা হয়, প্রায় ৩০ লাখ মামলার ভারে বিচার বিভাগ আজ ন্যুব্জ এবং ক্রমাগতভাবে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র ১৬/১৭শ’ বিচারকের পক্ষে এই সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা কখনই সম্ভব নয়। সর্বশেষ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন ও রিভিশনাল জরিপ সংক্রান্ত ল্যাণ্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল করার ফলে অতি অল্প সময়ে লাখ লাখ মোকাদ্দমার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি আরব্রিটেশন মোকদ্দমার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতেও বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে।
চিঠিতে আইন কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মানের বিষয়ে বলা হয়, এটি একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর একটি নিজস্ব ঠিকানা ও স্থাপনা প্রয়োজন। বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট ভবনের তিনটি ফ্লোরের সাতটি কক্ষে কমিশনের কাজ কায়ক্লেশে চলছে। আইন কমিশনের আবাসন সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের লক্ষ্যে বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট ভবনের ১০ ও ১১ তলা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারন করে যথাযথ পরিসরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কক্ষ নির্মানের নিমিত্তে বাজেট বরাদ্দসহ আনুষঙ্গিক সকল ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় স্বার্থে অনুরোধ করা হয়েছিলো। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে কোন প্রতিফলন নেই।