পথশিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। স্বজনহারা শিশুরা শহরে এসে জীবন সংগ্রামে নামে। অচেনা শহরে খেয়ে না খেয়ে জীবন পার করে। রাতে থাকে রাস্তা, সরকারি স্থাপনা কিংবা রেল স্টেশনে। অভিভাবকহীন এ সব শিশু ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, পিকেটিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
বিআইডিএস ও ইউনিসেফের এক গবেষণা বলছে—দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। কেবল ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু। চলতি বছর শেষে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪ জনে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জন।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের গবেষণা থেকে জানা যায়—পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পটে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে—ঢাকায় মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েশিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই শিশুদের বেশিরভাগ পথশিশু। আর মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসছে।
অপর একটি গবেষণা জরিপ থেকে জানা গেছে—মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে জড়িত ৩৫ শতাংশ, ছিনতাই, নেশাদ্রব্য বিক্রয়কারী এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ শিশু।
প্রতিদিন রাজধানীতে অসংখ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। অনুসন্ধানে জানা যায়—এ সব ছিনতাইয়ের কাজে যারা জড়িত, তাদের বেশির ভাগের বয়স ১০ থেকে ১৬ বছর। অনেক সময় চক্রটি সংঘবদ্ধ হয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে সাধারণ মানুষের মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। পথশিশুরা সংসারের ঘানি টানতে কিংবা মাদকের টাকা জোগাড় করতে রোজগারের সহজ পথ হিসেবে ছিনতাইকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
মাদক সেবন এবং চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে পথশিশুরা। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তির অলিগলিতে পথশিশুদের মাদক সেবনের দৃশ্য চোখে পড়ে। সারা দিন কাগজ বা অন্যান্য ভাঙ্গারির মালামাল কুড়িয়ে তা সংশ্লিষ্ট দোকানে বিক্রি করে উপার্জিত টাকা ব্যয় করে মাদক সেবনে। অন্য দিকে, একশ্রেণির মাদক ব্যবসায়ী পথশিশুদের দিয়েই মাদক সরবরাহ, ব্যবসা কিংবা পাচার করছে।
রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ সব ধরনের বাসস্ট্যান্ড, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে, পার্কসহ রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মাদকাসক্ত পথশিশুদের দেখা যায়। তবে ঢাকার বাইরেও এরা সংখ্যায় কম নয়। দিন দিন সারা দেশে বাড়ছে এসব পথশিশুর সংখ্যা। সঙ্গে বাড়ছে অপরাধ এবং মাদক সেবনকারীর সংখ্যা।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক মেজর মাকসুদুল আলম বলেন, ‘আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের সেবায় এবং নিরাপত্তা বিধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পথশিশুর বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। এ ব্যাপারে র্যাব নিয়মিত মনিটরিং করছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পলিসি করা উচিত। ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত ফান্ড থাকা চাই।’
তিনি বলেন, ‘পথশিশুদের অপরাধ প্রবণতা কমাতে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এই সংখ্যাটা বাড়াতে হবে। পথশিশুদের দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজের ভলান্টিয়ারি করানো যেতে পারে। তাহলেই ধীরে ধীরে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।
