বিশ্বকাপের প্রতিশোধ মিরপুরে

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৫, ০২:২৮

কোথায় মিরপুর! কোথায় সমুদ্র!

শত কিলোমিটার দূরের বঙ্গোপসাগর ভৌগলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে কাল হাজির হলো মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে। ফ্লাড লাইটের বিভ্রম তৈরী করা আলোয় স্টেডিয়ামের গ্যালারি হয়ে উঠলো সমুদ্রের ঢেউ; আর মানবকণ্ঠ হয়ে উঠলো গগনবিদারী গর্জন। আলাদা করে কোনো শব্দ বোঝার উপায় নেই। একটাই শব্দ হুঙ্কার হয়ে কানে বাজেÑবাংলাদেশ, বাংলাদেশ!
তা সমুদ্র হয়ে ওঠার মতোই উপলক্ষই বটে।
বিশ^কাপ কোয়ার্টার ফাইনালের বিপুল বিতর্ক, এই ম্যাচের মহা আফসোস এবং একটার পর একটা উত্তেজনাপূর্ন ঘটনা পাশে রেখে, সবকিছুকে ম্লান করে দিয়ে বিশে^র অন্যতম শক্তিশালী ওয়ানডে দল ভারতকে নিয়ে ছেলেখেলা করলো বাংলাদেশ। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলকে ৭৯ রানে হারিয়ে মহাউল্লাসে মাঠ ছাড়লো বাংলাদেশের বীর সৈনিকেরা।
তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকারের দারুন শুরু এবং সাকিব আল হাসানের দারুন ইনিংস মেরামতের সুবাদে ৪৯.৪ ওভারে অলআউট হওয়ার আগে বাংলাদেশ রান তুলেছিলো ৩০৭; ভারতের বিপক্ষে নিজেদের সর্বোচ্চ। জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশের চার পেসারের দূরন্ত বোলিংয়ে; বিশেষত অভিষিক্ত কিশোর মুস্তাফিজুর রহমানের তোপে ৪৬ ওভারেই ২২৮ রানে গুড়িয়ে গেলো ভারত।
বাংলাদেশের বিশাল সংগ্রহ তাড়া করতে ভয় জাগানো শুরুই করেছিলো ভারত। বিনা উইকেটে ৯৫ রান তুলে ফেলেছিলো তারা। পরপর দুই উইকেট নিয়ে ভারতীয় শিবিরে কাঁপন ধরিয়ে দেন ভারতের বিপক্ষে সবসময়ই উজ্জ্বল তাসকিন আহমেদ। এরপর মূল আঘাতটা করেন আসলে অভিষিক্ত বাহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান।
বাহাতি প্রাকৃতিক আউট সুইং তো ছিলোই, সেই সঙ্গে স্লোয়ার ও কাটার ডেলিভারিতে ভারতের বিখ্যাত মিডল ও টপ অর্ডারকে কার্যত বিভ্রান্ত ও অকার্যকর করে দেন মুমÍাফিজ। ভয়ানক হয়ে ওঠা জোড়া ডাবল সেঞ্চুরির মালিক রোহিত শর্মাকে ফিরিয়ে শুরু করেন। এরপর আজিঙ্কা রাহানেকে আউট করেন। এর মধ্যে ধোনির আঘাতে আহত হয়ে একবার মাঠও ছাড়তে হয়। আর ফিরে এসে পরপর দুই বলে ফিরিয়ে দেন ভারতকে লড়াইয়ে ফেরাতে থাকা রায়না ও উইকেটে আসা অশি^নকে। আর শেষ প্রতিরোধ গড়া জাদেজাকে আউট করে নিজের ৫ উইকেট ও দলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেন মুস্তাফিজুর। 
এর আগে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে টসে জিতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটা হয়েছিলো অসাধারণ। তামিম ও সৌম্যর ১০২ রানের পার্টনারশিপটাকে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়াবহ উদ্বোধনী জুটি বলে দেওয়া যায়। মাত্র ১৩.৪ ওভারে তামিম ও সৌম্য বিনা উইকেটে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ করে ফেললেন ১০২ রান; ওভারপ্রতি রান উঠলো এই সময়ে ৭.৪৬ করে।
একটা সময় মনে হচ্ছিলো, বাংলাদেশের রেকর্ড ধরেই নাড়াচাড়া শুরু করবেন দুই ওপেনার। কিন্তু দূর্ভাগ্য সেটা হতে দিলো না। তামিম ইকবালের ডিফেন্স করা বলটায় রান ছিলো না। তারপরও সৌম্য দৌড় শুরু করেছিলেন। তামিমও ফেরাতে দেরী করে ফেললেন। ফলে রানআউট হয়ে ফিরলেন ৪০ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ৫৪ রানের ইনিংস খেলা সৌম্য। ব্যাপারটা দুঃখজনক হলেও ইনফর্ম ব্যাটিং লাইনআপের কারণে খুব বিপদ বলে মনে হচ্ছিল না।
বিপদটা নিয়ে এলো বৃষ্টি।
ইনিংসের ১৬তম ওভারে, বেলা ৪টের সময় নামলো বৃষ্টি। এক ঘন্টা পর খেলা যখন শুরু হলো, তখন একেবারে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ যেন ব্যাটিং করতে নামলো। যে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বৃষ্টির আগে ভারতের সব বোলারকেই গলির বোলার বানিয়ে ফেলেছিলেন, তারাই নড়বড়ে হয়ে গেলেন।
তামিম ইকবাল একেবারেই ভুল সিদ্ধান্তে অশি^নের বল তুলে মারতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন; নামের পাশে তখন তার ৬২ বলে ৭টি চার ও ১টি ছক্কায় সাড়ানো ৬০ রান। এরপর লিটন ও মুশফিক আরও হতাশ করে ফিরলেন ৮ ও ১৪ রানে। ৭ ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলতে নামা বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের লেজ দেখা যাচ্ছে তখন।
আর এখান থেকেই একেবারে ভিন্ন এক রূপে আবির্ভূত হলেন সাকিব আল হাসান।
প্রথম ৩৯ বলে মাত্র ২৮ রান করলেন সাকিব; এর মধ্যে একটি মাত্র বাউন্ডারি। ধৈর্য্য দেখিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চললেন ইনিংসটাকে নিয়ে। অবশ্য অন্য প্রান্তে তরুন সাব্বিরের লাইসেন্স ছিলো পিটিয়ে খেলার। এই দু জন পঞ্চম উইকেটে ৮৩ রান যোগ করলেন। আর জুটির তুলনামূলক আগ্রাসী সাব্বিরের ৪৪ বলে ৪১ রানের ইনিংস শেষ হওয়ায় ভাঙলো এই প্রতিরোধ। সাকিব এরপরও এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন নাসিরকে নিয়ে। কিন্তু সাকিবের হঠাৎ ধৈর্য হারিয়ে ফেলা শটে শেষ হলো তার ৬৮ বলে ৫২ রানের স্বভাববিরুদ্ধ ইনিংসটা।

এরপরের টুকু নাসির ও মাশরাফির সামান্য, তবে বীরত্বপূর্ন প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণের গল্প।