সুন্দরবনের ছোট্ট বাঘ

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৫, ২২:০৭

কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল?’ তিনি প্রথমে একটু সময় নিজে ভাবলেন। তারপর মিডিয়া ম্যানেজারের দিকে তাকালেন। সেখান থেকে সদুত্তর না পেয়ে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার দিকে তাকালেন—ভাই, কী বলবো!

 
বাইশ গজে যার বলের উত্তর খুঁজে পেতে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেলো ব্যাটসম্যানদের, যার প্রতিটা কাটারকে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার বলে মনে হল; সেই মুস্তাফিজুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী বলবেন।
 
মাত্রই কৈশোর পার করেছেন। কিন্তু মুখে, চোখে এখনও কৈশোরের ছাপ ষোলো আনা রয়ে গেছে। লিকলিকে শরীরটা আর নিষ্পাপ চোখ দুটো পরিষ্কার বলে দেয়, এই জগতের জটিলতা এখনও স্পর্শ করতে পারেনি মুস্তাফিজকে। তার কাছে ক্রিকেট মানে, মাশরাফি ভাই যা বলেন!
 
সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ থানার সুদূর এক গ্রামের ছেলে এই মুস্তাফিজ। তার গ্রাম তেতুলিয়া থেকে শহর যতদূরে, তার চেয়ে ঢের কাছে সুন্দরবন। ছোটবেলায় হয়তো ভাইয়েদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে দু একবার বাঘের ডাকও শুনে থাকবেন। তা বাঘের ডাক তিনি সরাসরি শুনুন, আর নাই শুনুন বৃহস্পতিবার মিরপুরে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ঠিকই বাঘের ডাক শুনিয়ে দিয়েছেন।
 
মাঠের বাইরে সহজ-সরল ছেলেটি, জীবনের জটিলতা এখনও স্পর্শ করতে পারেনি যাকে, মাঠে বল হাতে সেই ছেলেটিই ভীষণ দুর্বোধ্য, জটিল! কোনো ডেলিভারি বাঁহাতির সহজাত অ্যাঙ্গেলে বেরিয়ে যাচ্ছে, কোনোটি আবার সুইং করে বেরোচ্ছে। কোনো কোনোটি আবার সোজা ঢুকছে। আর এসবের সঙ্গে সেই ‘বিষাক্ত’ স্লোয়ার, কাটার!
 
স্লোয়ার ডেলিভারি ক্রিকেটে পুরনো হয়ে গেছে অনেকদিন। ব্যাটসম্যানদের জন্য এটি এমন কোনো চমকও নয়। কিন্তু মুস্তাফিজ তার নিয়মিত ডেলিভারির সঙ্গে এই ‘স্টক ডেলিভারি’ এমন ভাবে মিশিয়ে দেন, ধরে ফেলা কঠিন। সাধারণ ডেলিভারির সঙ্গে এটার অ্যাকশন আর গতি বৈচিত্র্যের তারতম্য এতটাই কম যে ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরাও যেন অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেলেন।
 
ওয়ানডের দুটি দ্বিশতকের মালিক রোহিত শর্মার কথাই ধরা যাক, যিনি পঞ্চাশ ছুঁয়ে ফেললে বড় ইনিংস খেলাকে যিনি অভ্যাসে পরিণত করেছেন। সেই রোহিত মুস্তাফিজের কাটারে বিভ্রান্ত হয়ে হতভম্ব তাকিয়ে থাকেন। টেকনিক্যালি এই ভারতের সবচেয়ে নিখুঁত ব্যাটসম্যান অজিঙ্কা রাহানে তল খুঁজে পান না। থিতু হয়ে যাওয়া রায়না-জাদেজাও এই কাটারে বশ মানলেন। সবাই জানত, মুস্তাফিজের হাত থেকে এই কাটার এলো বলে। কিন্তু প্রস্তুত থেকেও মিলল না বাঁচার উপায়। অনুমেয় মুস্তাফিজই কী অসাধারণ!
 
আনকোরা তরুণের বাঁহাতের ঝলকে ভারত এতটাই দিশাহারা যে, দলের অধিপতি, ক্রিকেটবিশ্বে যার পরিচিতি ‘ক্যাপ্টেন কুল’ হিসেবে, তিনিও উদভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। এক যুগ ধরে ক্রিকেট আঙিনায় পদচারণায় পোড় খাওয়া মহেন্দ্র সিং ধোনি যখন তার সারা জীবনে অর্জিত ভাবমূর্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অভিষিক্ত এক তরুণকে দৃষ্টিকটু ভাবে ধাক্কা মেরে বসেন, তখন আনকোরা ওই তরুণই আসলে নতুন উচ্চতায় উঠে যান। ম্যাচ শেষে স্বয়ং ধেনির কণ্ঠেই সেই নতুন উচ্চতার ঘোষণা, ‘মুস্তাফিজের স্লোয়ারের জবাব জানা ছিল না আমাদের।’