চকের বাহারি ইফতারের আবেদন কমেনি এতটুকু

আপডেট : ২০ জুন ২০১৫, ০০:৪৫

সেই পুরনো দৃশ্য। অথচ কি প্রাণবন্ত! ইফতার সামগ্রী নিয়ে একজনের হাঁকডাক মিলিয়ে না যেতেই আরেকজনের শুরু। পুরনো ঢাকার চকের ইফতার বাজারের সেই পুরনো চিত্র এক বছরের ব্যবধানে আবার ফিরে এসেছে। সময় গড়িয়েছে, যুগের পর যুগ কিন্তু রোজাদারের কাছে চকবাজারের সেই ঐতিহ্যবাহী ইফতারের টান ও আবেগ যেন এতটুকু কমেনি !

 
গতকাল শুক্রবার পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম দিন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে চকের  ইফতার বাজার। নানা পদের, নানা স্বাদের ইফতার কিনতে ক্রেতারা রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে চকবাজারে। গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় ভিড়টা ছিল চোখে পড়ার মতো।
 
বিক্রেতা আমজাদ বলেন, আছর নামাজের পর ভিড় হয় সবচেয়ে বেশি। পুরো ইফতারবাজার একদম ভিড়ে গমগম করে। তখন পুরনো ঢাকার ক্রেতাদের চাপ বেশি থাকে।
 
গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ইফতার কিনতে আসা কবির হোসেন জানান, প্রতি বছর প্রথম রমজানে তিনি চকে ইফতার কিনতে আসেন। হরেক করমের ইফতারের স্বাদ নিতেই এখানে ছুটে আসা বলে তিনি জানান।
 
একই কথা বললেন, উত্তরার বাসিন্দা আলতাফ। তিনি বলেন, এখানে ইফতার কিনতে না এলে মনে হয় রমজান শুরুই হয়নি। তবে প্রতিদিনতো আর আসা সম্ভব না। সবমিলিয়ে রমজানের ৪/৫ দিন এখান থেকে ইফতার কিনি।
 
অনেকেরই জিজ্ঞাসা, চকবাজারের ইফতার সামগ্রীতে কি আছে যা নিয়ে এত আলোচনা। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, এই ইফতার বাজারের যে কারিগর তারা অনেকেই এসেছেন বংশ পরম্পরায়। এদের পূর্ব পুরুষরা কয়েকশ বছর আগে থেকে এখানে ইফতার তৈরির কাজ করেন।
 
ইতিহাসবিদের মতে, ঢাকার বয়সের সমান চকবাজারের ইফতারির বাজার। তাদের মতে, ১৭০২ সালে ঢাকার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে আধুনিক বাজারে পরিণত করেন। তখন থেকেই প্রতি রমজানে এখানে জমকালো ইফতার বাজার বসে। আবার অনেকেই বলেন, মোগল আমলে পুরনো ঢাকার চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনে একটি কূপ ছিল। তার চারপাশে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বিক্রি করা হতো হরেক রকম নবাবি ইফতার সামগ্রী। কালের বিবর্তনে আজকের এই চকের ইফতার বাজার। এছাড়া কি নেই এখানকার ইফতার সামগ্রীর তালিকাতে?
 
চকবাজারের সবচেয়ে আলোচিত ইফতার হচ্ছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’। পুরনো ঢাকার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবার এটি। গরুর কিমা, কলিজা, মগজ, চিকেন, চিড়া, ডাল, সুতি কাবাব, আলু ও ডিমসহ ১২টি পণ্য ও ১২টি মসলার সমন্বয়ে এই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ তৈরি করা হয়। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা।
 
এ ব্যাপারে বিক্রেতা সালেকিন বলেন, আমার দাদা কামেল মহাজন ৬৫ বছর আগে প্রথম এই ইফতার সামগ্রী তৈরি করেন। এরপর আমার বাবা এটা তৈরি করেছেন, এখন আমি করি। চকবাজারে আরেকটি ঐতিহ্যবাহী ইফতার পণ্য ‘শাহী দই বড়া’। মাসকলাই ও টক দই দিয়ে এই বড়া তৈরি করা হয়। সঙ্গে থাকে দারুচিনি, এলাচ, ধনিয়া, গোলমরিচ, পুদিনা পাতা ও কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন মসলা বলে জানালেন বিক্রেতা ইউসুফ। তিনি বলেন, ইফতার বাজারে শাহী দই বড়ার ভালো চাহিদা। শাহী দই বড়ার ছোট বাটি ৬০ টাকা ও বড় বাটি ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
 
এই বাজারের ‘শাহী জিলাপী’র কথা না বললে অনেক কিছুই বাদ থেকে যাবে। বিক্রেতা নাজিমউদ্দিন পিচ্চি বলেন, শাহী জিলাপী ছাড়া ইফতার ঠিক পূর্ণ হয় না। প্রতি কেজি শাহী জিলাপী ১২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন বলে তিনি জানান। এছাড়া ছোট, বোম্বাই ও বাতাসা জিলাপীর কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। গত ৩/৪ বছর ধরেই এই দাম বলে তিনি জানান।
 
চকবাজারের অন্যান্য ইফতার সামগ্রীর মধ্যে গরুর সুতি কাবাব ৬শ টাকা ও খাসির ৭শ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি, কারি কাবাব প্রতিটি ৩০ টাকা, গুটি কাবাব ও টিকা কাবাব প্রতিটি ১০ টাকা, ইরানি কাবাব ১২ টাকা, শাহী ডিম চপ প্রতিটি ২০ টাকা, শাহী হালিম বাটির আকারভেদে ৪৫০, ৩৫০ ও ১৫০ টাকা। এছাড়া খাসির রান প্রতিটি ৪৫০ টাকা, কয়েক পাখির রোস্ট প্রতিটি ১০০ টাকা, চিকেন ফ্রাই প্রতিটি ৩৫০ টাকা, আস্ত মুরগীর কাবার ৪০০ টাকা, কিমা সমুচা ও পনির সমুচা প্রতিটি ৪ টাকা, শাকফুলুরি ৪ টাকা, আলু চপ ৪ টাকা, বেগুনি ৪ টাকা, পিঁয়াজু ৪ টাকা, পাকুরা ৪ টাকা, গরুর টিকা ৬ টাকা, খাসির টিকা ৩০ টাকা, পনির ও সবজি পরোটা প্রতিটি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছোলা ১৩০  থেকে ১৪০ টাকা ও মুড়ি মানভেদে ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
 

বিক্রেতারা জানালেন, এ বছর ভোজ্যতেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় দাম গত বছরের মতোই রয়েছে। বিক্রেতা নাজিমউদ্দিন পিচ্চি জানালেন, রমজানে চকে ইফতার বিক্রি তাদের মূল পেশা নয়, বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রাখতেই ইফতার বিক্রি করা। তাই এটা তাদের কাছে ব্যবসা নয়, অনেকটা রোজাদারের খেদমতের মতো। লাভ হচ্ছে না লোকসান হচ্ছে সেদিকে তাকাই না।