সাতক্ষীরা থেকে মিরপুর স্টেডিয়াম। দূরত্ব ৩৩০ কিলোমিটার হলেও তরুণ মুস্তাফিজ তার অবিশ্বাস্য পারফরমেন্স দিয়ে এই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখন শুধু সাতক্ষীরার মুস্তাফিজ নন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের হূদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। প্রথম ম্যাচের মতো দ্বিতীয় ম্যাচেও ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে দিতে একাই নিয়েছেন ৬ উইকেট। ক্রিকেট বিশ্বে মুস্তাফিজ এখন নতুন বিস্ময়। বিস্ময়-বালক মুস্তাফিজের বলে কাঁপছে ভারত। তাই দেশজুড়ে এখন শুরু হয়েছে মুস্তাফিজ বন্দনা। সাতক্ষীরাবাসীর কাছে মুস্তাফিজ মানেই সুন্দরবনের বাঘের গর্জন। জেলাবাসী তার নাম দিয়েছে ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’।
গতকাল দেশবাসী দেখেছে ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’র সেই গর্জন। মুস্তাফিজুর রহমানের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি ভারতের ব্যাটসম্যানরা। এই বাঁহাতি পেসারের ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি ভারত। ৪৫ ওভারে ২০০ রানে অলআউট হয়ে যায় দলটি। ‘ডাকওয়ার্থ লুইস’ পদ্ধতিতে জয়ের জন্য বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯৯ রান। প্রসঙ্গত, প্রথম ওয়ানডেতে দলের ৭৯ রানের জয়ে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেন মুস্তাফিজ। এবার ৬ উইকেট নিতে খরচ করেন মাত্র ৪৩ রান। পাঁচ ওভারের প্রথম স্পেলে ৩২ রানে এক উইকেট নেওয়া মুস্তাফিজ পরের স্পেলে মাত্র ১১ রানে নেন পাঁচ উইকেট।
সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের ছেলে মুস্তাফিজুর রহমান। বাবা ব্যবসায়ী আবুল কাশেম গাজী। মা মাহমুদা খাতুন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মুস্তাফিজ সবার ছোট। ১৯৯৫ সালে ৬ সেপ্টেম্বর তার জন্ম। তার ক্রিকেট খেলায় আসার পিছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান অনেক। কালীগঞ্জ থেকে প্রতিদিন সাতক্ষীরা শহরে মোটরসাইকেলের পেছনে চড়িয়ে নিয়ে যেতেন তিনি। তার বড় ভাই এক সময় ক্রিকেট খেলতেন, মেজ ভাইও কম যান না, আর সেজ ভাই এখনও ক্রিকেট খেলেন।
ছেলের ভাল খেলার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বাবা আবুল কাশেম গাজী ইত্তেফাককে জানান, পরিবারের সদস্যরা এক সঙ্গে বসে গতকাল খেলা দেখেছেন। ভাল খেলে মুস্তাফিজ দেশের সম্মান উজ্জ্বল করেছে। মুস্তাফিজ আরো ভাল খেলুক এই দোয়া করেন তিনি। আবেগজড়িত কণ্ঠে আবুল কাশেম গাজী বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। তিনি আরো বলেন, মুস্তাফিজ আজকে আমার একার ছেলে নয়, সে গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের রণাঙ্গনে লড়ছে।
মুস্তাফিজের বড় ভাই মাহফুজার রহমান মিঠু খুলনায় গ্রামীণফোনের টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত। গতকাল খুলনায় বড় ছেলের বাসায় ছিলেন মোস্তাফিজের মা মাহমুদা খাতুন। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে মাহমুদ খাতুন জানান, ছোট ছেলের মাধ্যমে এতো সম্মানিত হবেন তা তিনি কখনো কল্পনা করেননি। ছেলের দুর্দান্ত খেলায় মুগ্ধ মা। খেলা শেষে মায়ের সাথে কথা বলেছেন মোস্তাফিজ।
ক্রিকেট খেলায় মুস্তাফিজের উঠে আসার ইতিহাস তুলে ধরে সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান পল্টু বলেন, পাঁচ বছর আগে সাতক্ষীরায় অনুর্ধ-১৪ ক্রিকেট বাছাই পর্বে মুস্তাফিজ নজর কাড়ে সবার। সেখান থেকে তার ক্রিকেট জীবনের পথচলা শুরু। সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের ‘ধারটা’। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন জেলা কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু। এরপর জেলাপর্যায়ে অনুর্ধ-১৬ ক্রিকেট খেলায় সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। পড়াশোনায় অতটা মন তার কখনই ছিল না। বাসায় তো বলেই দিয়েছিল, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তোমরা আর জোর করো না। স্কুল ফাঁকি দিয়ে সে ক্রিকেট খেলতে যেত। এরপর থেকে ক্রিকেটই তার ধ্যান-জ্ঞান। বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্র্যাকটিস করতেন মুস্তাফিজ। জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। তিন বছর আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনুর্ধ-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভাবনার দ্যুতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপে। ঝুলি ভরেছিলেন ৯ উইকেটে। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। প্রথম শ্রেণীতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। ছয় মাস আগে অভিষেক হয় ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে। অভিষেক ম্যাচেই চোখ ধাঁধানো পারফর্মেন্স বাংলাদেশ দলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভূত হলেন এই তরুণ পেসার।
ছোট্ট এ ক্যারিয়ারে উজ্জ্বল পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে মুস্তাফিজ কতটা প্রতিভাধর। মুস্তাফিজ এখন সাতক্ষীরা তথা দেশের গর্ব। বাঁহাতি পেসার। ইন সুয়িং, আউট সুয়িং, ওভারে একটি দুটি রির্ভাস সুয়িং। জাতীয় দলে কৃতিত্বপূর্ণ খেলার পর সে সাতক্ষীরাবাসীর কাছে হয়ে উঠেছে নয়নের মণি। মুস্তাফিজের স্বপ্ন পূরণে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন তার বাবা-মাসহ গোটা জেলাবাসী। গতকালও মুস্তাফিজের বাড়ির সবার মনেই ছিল ঈদের আনন্দ। মুস্তাফিজের গ্রামের বাড়িতে চলছে আনন্দ উত্সব। তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। তার বাবা-মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন সকলে।