ইউক্রেন সংকট

আপডেট : ২২ জুন ২০১৫, ০২:৫৮

ইউক্রেন অশান্ত হয়ে পড়ার পর দেশটিতে পড়তে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন এক প্রকার বিপন্ন। সেখানে তারা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারছে না। কারণ যুদ্ধের ডামাডোলে গত এক বছর জীবন হাতের মুঠোয় করে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে আছে। না পারছে দেশে ফিরতে, না পারছে নিশ্চিন্তে থাকতে। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ে রয়েছে দোনেস্কে পড়তে আসা মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা। কারণ ইউক্রেন অশান্ত হওয়ার পর থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙ্গে পড়েছে দেশটিতে। দোনেস্ক থেকে পাস করা এসব শিক্ষার্থীর চিকিত্সা সনদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে কী-না এই বিষয়টিই এখন তাদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।

 
দেশটির মেডিক্যাল কলেজগুলোর মধ্যে এক সময় সবচেয়ে বেশি সুনাম ছিলো দোনেস্কের। কিন্তু গত বছর থেকে রাশিয়াপন্থি বিদ্রোহীরা দোনেস্ক দখল করার পর থেকে সব কিছু যেন বদলে যেতে থাকলো।
 
দোনেস্ক স্টেট মেডিক্যাল ভার্সিটির করুণ দশার কথা ফুটে উঠেছে এর গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইলেনা সুটসকেই এর কথাতেই। তিনি জানান, গত বছরও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই হাজারের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলো। সেখানে আজ মাত্র ৮৫ জন রয়েছে। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরুর পর সুনামের সাথেই পার করেছে ৮৫টি বছর। নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ইউক্রেনের সেরা মেডিক্যাল কলেজগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এমনকি সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র থেকেও শিক্ষার্থীরা আসতো এখানে লেখাপড়া করতে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে দোনেস্কে রাশিয়াপন্থি বিদ্রোহীরা গঠন করে দোনেস্ক পিপলস রিপাবলিক (ডিপিআর)। এই ডিপিআর আজ বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। বিদ্রোহীরা দোনেস্ক দখলের পর থেকে সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় ইউক্রেনীয় ভাষা বন্ধ করে তার জায়গায় ইংরেজি এবং রাশিয়ান ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে।
 
২০০৭ সালে সৌদি আরব থেকে ইউক্রেনে চিকিত্সা বিজ্ঞান পড়তে আসেন ইরাকের খাদেম আলী। তার মতো অনেক শিক্ষার্থীই তাদের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যত্ নিয়ে মারাত্মক চিন্তিত। ডিপিআরের অধীনে থাকা দোনেস্ক মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের আশঙ্কার অন্যতম কারণ হচ্ছে, ডিপিআর স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র গঠন করেছে। তাদের কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। ফলে ডিপিআরের অধীনে যেসব সনদ প্রত্যয়ন করা হবে তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে কি-না এই নিয়ে তারা খুবই চিন্তিত। তাদের ইউক্রেনের সনদ পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এখন পাবে ডিপিআরের সনদ। খাদেম আলীর মতো শিক্ষার্থীদের অভিমত, দোনেস্ক এর গোলাগুলির সাথে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তারা এখন আর এগুলোকে ভয় পান না। তাদের প্রধান চিন্তা তাদের চিকিত্সা সনদ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবে কি-না। বাগদাদ যুদ্ধ থেকে বাঁচতে ২০০৭ সালে ইউক্রেনে এসেছিলেন খাদেম আলী। কিন্তু ভাগ্য কি নির্মম, এখানে এসেও স্বস্তি নেই তার। প্রথম দিকে লেখাপড়ার খরচ নিয়ে তাকে কোন রকম চিন্তা করতে হতো না। বাবাই পাঠিয়ে দিতেন সব খরচ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় তার বাবার আর্থিক অবস্থা। ফলে অর্থাভাবে একসময় লেখাপড়া থেকেও পেছনে পড়েন খাদেম। খাদেমের মতো কয়েকজন শিক্ষার্থীই এখন তাদের থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে বিপাকে। শিক্ষার্থীরা বলেন, ইউক্রেন থেকে সনদ পাবো আশায় কয়েক বছর ধরে বিদেশের মাটিতে পড়ে আছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি রাশিয়ার সাথে যোগাযোগ করে রাশিয়ান সনদও আমাদের দিতো তাহলে আমরা উপকৃত হতাম।      
 
খাদেমের মতো দোনেস্কে চিকিত্সা বিজ্ঞানে পড়তে গেছেন ফিলিস্তিনের সেফায়েত নুজার। তার কথায়, আমরা আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে আমাদের সনদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে আমরা সবাই দোনেস্ক ত্যাগ করবো। তবে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য দোনেস্ক ছাড়াটাও অসুবিধার। চার বছরের জেনারেল মেডিসিন কোর্স সম্পন্ন করা এক শিক্ষার্থী বিয়ে করেছেন এখানকারই এক নারীকে। তার ৫ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। দোনেস্ক এ চিকিত্সক হিসাবে প্রাকটিসও চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সব কিছু মিলিয়ে তার জন্য এখান থেকে যাওয়াও সম্ভব নয় আবার থেকে যাওয়াও সমস্যার।
 

পড়ার খরচ কম বলে সেখানে  পড়তে গিয়েছিলেন ভারতের সেনিয়ে রাব। তার চাচা দোনেস্ক মেডিক্যাল কলেজ থেকে ২০১০ সালে লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরলে তার কথাতেই সেখানে যান সেনিয়ে। বর্তমানে দেশ থেকে টাকা আনা ও ভিসার মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে নানা জটিলতার রয়েছে তার মতো অনেক শিক্ষার্থী। ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে অনেকের মতো তিনি নিজেও তা জানেন না।