সুশাসনের অভাব ও প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতি-অনিয়মই বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায়। বুধবার জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অনেকেই এ রকম প্রায় অভিন্ন মত দিয়ে বলেছেন, সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। আর প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়বে। এ ছাড়া, বিনিয়োগ বোর্ড ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আলোচনায় অংশ নেয়া সংসদ সদস্যরা। একই সঙ্গে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে যেসব মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে, এবার তাদের টাকা কমিয়ে যারা সফল হয়েছে তাদের মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বিনিয়োগসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকরের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বোর্ড বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অবকাঠামো সৃষ্টি ও নীতিমালা বাস্তবায়নে ‘চরমভাবে ব্যর্থ’ হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে এই বিনিয়োগ বোর্ড বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এর দায়ভার বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ডকেই নিতে হবে।
এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে তিনি বলেন—পেশাদার, দক্ষ, পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমী ব্যক্তিদের দিয়ে ঢেলে সাজালেই বিনিয়োগ বোর্ড ব্যর্থতা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।
হানিফ বলেন, ধীরে ধীরে দেশে আমরা বিদ্যুত্ উত্পাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হলেও শিল্প কলকারখানায় প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। গ্যাস সরবরাহের জন্য হাজার হাজার আবেদন পেট্রোবাংলায় জমা পড়ে আছে।
শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কিন্তু এবারের বাজেটে উচ্চ শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব ‘নজিরবিহীন’। প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শতকরা ১০ ভাগ মূসক নির্ধারণের প্রস্তাব নজিরবিহীন, যা আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও শিক্ষানীতির পরিপন্থি। শিক্ষাব্যয় কমাতে এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান হানিফ।
জাতীয় পার্টির (জাপা) এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটকে চার কোটি তরুণ স্বাগত জনিয়েছে। কারণ তথ্য-প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের ফলে তারা গোটা বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুত্, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, যেহেতু আমরা সরকারেও রয়েছি, তাই এ সব আমাদের সরকারেরই সাফল্য। আবার বিরোধী দলেও থাকার কারণে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাও করতে পারছি। সে জন্য বলছি, এত উন্নয়নের মধ্যেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবেই অনেকের ঠাঁই হচ্ছে বিদেশের গণকবরে। এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দের কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা, সব মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ১০ হাজার টাকা করার এবং দক্ষিণাঞ্চলে কুয়াকাটা পর্যটন এলাকার উন্নয়নের দাবি জানান তিনি।
ক্রিকেটে একের পর এক সাফল্য অর্জন করায় সংসদে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে হাওলাদার বলেন, ‘সব সরকারের আমলেই ক্রিকেট খেলা হয়েছে। কিন্তু আপনার সময়ের মতো এত সাফল্য ক্রিকেটে কখনো আসেনি। আপনি ক্রিকেটকে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দিয়ে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। আপনি আসলেই ভাগ্যবতী। আপনার শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে আনছে। ক্রিকেট খেলা দেখতে আপনি মাঠে ছুটে যান। এ কথা এখন তরুণ, ছাত্র, যুবকের মুখে-মুখে।’
৫০ লাখ প্রবাসীদের মধ্যে এখনো মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) দিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের ইসরাফিল আলম।
তিনি বলেন, এমআরপি দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্তদের পারফরমেন্স ভালো নয়। নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মাসিক ভাতা দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, পাশাপাশি স্কুলে পাঠদান করেও একজন সরকারের বেতনভাতা পান আর অন্যজন পান না- এটা হতে পারে না। বেতন দিতে না পারেন, তাদের খেতে তো দিতে হবে। সংবাদপত্রে অষ্টম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন, দফাদার-চকিদারদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো গঠনের এবং ভেজাল খাদ্য রোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিম আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘সংসদে বিরোধীদল থাকলেও আমাকেই বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে হয়। আমি কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বলি। এ জন্য অনেকেই আমাকে বাঁকা চোখে দেখেন।’
তিনি বলেন, ‘সংসদে বিরোধীদল সেভাবে দায়িত্ব পালন করে না বলেই আমাকে বাধ্য হয়ে বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে হয়।’
প্রধান বিরোধীদল জাপার ফখরুল ইমাম বলেন, অর্থমন্ত্রী কোন দর্শনে এবারের বাজেট প্রণয়ন করেছেন, সেটি তিনি স্পষ্ট বলতে পারেননি। বাজেট বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আস্থা থেকেই স্বস্তি, স্বস্তি থেকে শান্তি, শান্তি থেকে স্থিতি এবং স্থিতি থেকে স্থিতিশীলতা আসে।’
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, উন্নয়নের পূর্বশর্ত বিনিয়োগ। যেভাবেই হোক, দেশি হোক আর বিদেশি হোক, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যারা বিনিয়োগ করতে উত্সাহী তাদের কী ভাবে ব্যাংক ঋণ দেয়া যায়, সেটাও ভাবতে হবে। এ জন্য একটি কমিশন গঠন করা উচিত। বিনিয়োগ বোর্ডকেও গতিশীল করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি এখন সারাবিশ্বে বিষ্ময়। এখানে উন্নয়ন, সত্য, মানুষকে ভালোবাসার, গণতন্ত্রের ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি জয়ী হয়েছে। আর জঙ্গিবাদ-সন্তাদের রাজনীতি পরাজিত হয়েছে।
জাপার আবদুল মুনীম চৌধুরী বাবু বলেন, প্রশাসনের সর্বত্র ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। এটি দূর করতে হবে।
সরকারি দলের নূরজাহান বেগম মুক্তা বলেন, ‘বিএনপি এখন মৃতপ্রায়। দলটি ক্লিনিক্যালি ডেড। বাঁচানোর জন্য এই দলকে এখন ফরমালিনে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। এই দেশে বিএনপি নামে কোনো দল থাকবে না, এটির জায়গা হবে জাদুঘরে। পরবর্তী প্রজন্ম জানবে—একসময় এ দেশে বিএনপি নামের একটি দল ছিল।’
