মানব পাচারকারীদের জাহাজে কেউ অসুস্থ হলে তাকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হতো। তারপর পেট চিড়ে নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে দেয়া হতো সাগরে। এসব হত্যাকাণ্ড দেখার পর জাহাজে থাকা বাকিরা ভয়ে চুপ করে থাকতো। কথাগুলো বলছিলেন মানব পাচারের শিকার মালয়েশিয়া ফেরত তপন বিশ্বাস। তপনের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কুদড়েদাহ গ্রামে।
তিন মাস সাগরে ভেসে থাকার করুণ বর্ণনা দেয়ার সময় তপন জানান, তাদের জাহাজে নির্যাতন, খাবার ও পানির অভাবে সাত জন অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঐ সব অসুস্থ ব্যক্তিদের পাচারকারীরা রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার পর পেট চিড়ে সাগরে ফেলে দিয়েছে। তপন জানান, পাশের গ্রাম হাটফাজিলপুরের সুমন মালয়েশিয়াতে থাকে। সুমন সেখানে বসেই মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো। সুমনের বাবা শ্রীকৃষ্ণের কাছে এক লাখ টাকা দিয়েছে তপনের পরিবার। মার্চ মাসে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ঢাকা যান। ঢাকায় ভাণ্ডারি নামে এক পাচারকারীর মাধ্যমে আরো কয়েক জনের সাথে তাকে প্রথমে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। এরপর তাদের তুলে দেয়া হয় ট্রলার মালিক হামিদের কাছে। চট্টগ্রাম থেকে ২৪৩ জনকে একটি ট্রলারে তুলে দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় কষ্টের জীবন। ঠিক মত খেতে দেয়া হতো না। থাইল্যান্ডে ঢোকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অস্ট্রেলিয়ার এক মালিকের এক ট্রলার এসে তাদের ডাকাতি করে নিয়ে যায়। ঐ জাহাজে গাদাগাদি করে ৮শ’ জনকে রাখা হয়েছিল। নড়াচড়া করলে মারধর করা হত। সিসি ক্যামেরা সেট করা ছিল জাহাজে। তেল ফুরিয়ে গেলে জাহাজ ভাসতে থাকে সাগরে। ভাসতে ভাসতে মালয়েশিয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যায় জাহাজ। জেলেদের নজরে এলে তারা তেল ও খাবার দেয়। তারা উপকূলের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তারপর জাহাজ থেকে লাফিয়ে পানিতে পড়ে সাঁতরে ডাঙ্গায় উঠে। তাদের উদ্ধারে করে মালয়েশিয়ার একটি ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখান থেকে দেশে পাঠানো হয় তাদের।
তারই মতো দেশে ফিরে দুর্দশার কথা বলেছেন কালীগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের ফিরোজ খাঁ। গ্রামের দালাল দেলওয়ার হোসেনের প্রলোভনে তিনি স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় রওনা হয়েছিলেন। ৩ মাস জাহাজে ছিলেন। জাহাজে মানুষ ছিলো চারশ’। প্রচণ্ড গরম আর পানির কষ্ট ছিলো। সারাদিনে এক মুঠো ভাত, ১টি কাঁচা মরিচ ও এক মগ পানি দেয়া হতো। বেশি চাইলে মারপিঠ করা হতো। তাদের জাহাজে ৩ জন অসুস্থ হলে হত্যার পর সাগরে ফেলে দেয়া হয়।
