চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দী লাখো মানুষ

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৫, ০০:৪৯

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। খাবার ও পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে বিপর্যস্ত।

 
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রামে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে কয়েক লাখ মানুষ গত কয়েকদিন ধরে বন্দী হয়ে রয়েছে। সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী ভাঙনে কয়েকশ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। নদীতে বিলীন হয়ে গেছে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্যা কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে আজ জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মেজবাহ উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘বন্যায় সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারিভাবে তাত্ক্ষণিকভাবে ৫০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আমাদের কাছে আগেরও কিছু চাল মজুদ রয়েছে। এসব চালও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিতরণ করা হবে। সার্বক্ষণিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
 
জেলা প্রশাসন জানায়, সাতকানিয়ায় ১৭টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। অনেকের বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সাতকানিয়া উপজেলার চরতি, আমিলাইষ, বাজালিয়া, কালিয়াইশ, এঁওচিয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। শঙ্খ নদীর ভাঙনে কয়েকশ ঘর-বাড়ি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে। চরতি ইউনিয়নের ওপর ব্রাহ্মণডেঙ্গা, মধ্যম চরতি, দ্বীপ চরতি, তুলাতলী, কালিয়াইশ এলাকায় বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলে শতাধিক ঘর-বাড়ি নদীতে ভেসে গেছে। শঙ্খ নদীতে পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে প্রবাহিত হচ্ছে। অব্যাহত ভারী বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির  প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে।
 
এদিকে চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন এলাকা গত কয়েকদিন যাবত্ পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে পানি নিষ্কাশিত হতে পারছে না। খাল ও নালাগুলো ভরাট থাকায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে হালিশহর, চান্দগাঁও, ষোলকবহর, আগ্রাবাদ, সিডিএ এভিনিউ, বাকলিয়া এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গত কয়েক দিনে তারা দুই শতাধিক পরিবারকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের মতে, প্রায় ৩০টি পাহাড়ে কয়েকশ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর বাসিন্দাদের জন্য তিনটি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এগুলো হলো লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শহীদ নগর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেলওয়ে কলোনী।
 
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। শনিবার সকালে ও দুপুরে চকরিয়া, রামু ও টেকনাফে আরো ৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় গত ২ দিনে পাহাড় ধস, গাছ চাপা পড়ে ও ঢলের পানিতে ডুবে মৃতের সংখ্যা ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার দুপুরে যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছেঃ চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের মোহাম্মদ আনোয়ার (৫৫), কাকাঁরা ইউনিয়নের কাইছার রহিম (১২) ও কৈয়ারবিলের ৩ বছরের এক শিশু, রামু উপজেলায় ফকির পাড়ার বাসিন্দা বাঁশ ব্যবসায়ী নুরুল আবছার (৪৩), কাজিরবিল এলাকার মোহাম্মদের মেয়ে কামরুন্নাহার (২০) ও এরশাদ উল্লাহর মেয়ে হুমাইরা (০৮), টেকনাফের বাহারছড়ার ইউনিয়নে পাহাড়ধসে নিহত মছুদা খাতুন (৪৫) ও তার মেয়ে শাহেনা আক্তার। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিলের পাশাপাশি দুর্গত এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।
 
মহেশখালী প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা দেড় থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও স্লুইস গেট দিয়ে বৃষ্টির পানি সমুদ্রে নেমে যেতে না পারায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন এলাকার এমপি আশেক উল্লাহ রফিক। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে পাহাড়ি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পানের বরজ, বাগান ও মৌসুমী ক্ষেত। অপরদিকে ভারী বর্ষণের কারণে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ ঘের এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরদিকে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ধস অব্যাহত রয়েছে। শাপলাপুরের ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক জানান, তার এলাকায় পাহাড় ধসে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। ১ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন।
 
টানা বৃষ্টির কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উপজেলার কুতুবজোম, মহেশখালী পৌর এলাকা, ছোট মহেশখালী, শাপলাপুর ও মাতারবাড়িতে সর্বাধিক ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার হোয়ানক, শাপলাপুর ও কালামার ছড়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন। ঢলের ফলে মহেশখালীর প্রধান দু’টি সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুতের বিভিন্ন টাওয়ার ও খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মহেশখালীতে বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ্এই অঞ্চলের অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার।
 
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, ৬ দিনের টানা বৃষ্টিপাতে রায়পুর, লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর ও চাঁদপুর (আংশিক) উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর সেচ প্রকল্প (সিআইপি) এলাকায় নিম্নাঞ্চলে ফসলী জমি ও বাড়িঘর জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নির্মাণ করায় বহু স্থানে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা স্থায়ীরূপ ধারণ করেছে। রায়পুর পৌর শহরের সরদার বাড়িসহ আশপাশের কয়েকটি বাড়ির প্রায় ২শ পরিবার ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানির মাঝে গত ৫ দিন ধরে বন্দী হয়ে আছে, পোহাচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। সিআইপি নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, প্রকল্পের হাজীমারা রেগুলেটর ও চরবাগাদি পাম্প হাউজ দ্বারা বিরতিহীনভাবে প্রকল্পের ভেতর হতে পানি নিষ্কাশনের কাজ চালানো হচ্ছে।
 
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের অব্যাহত ভারি বৃষ্টিতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ফেরি, লঞ্চ, কার্গো, নৌকা চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হয়। পদ্মা যমুনায় প্রবল স্রোতের কারণে ফেরি লঞ্চ ভাটিতে টেনে নেয়ার ঘটনায় যাত্রী সাধারণ চরম দুর্ভোগ পোহায় । ঘুরপথে অতিরিক্ত সময় নিয়ে এ রুটে নৌযান চলাচল করছে। অপরদিকে নদী ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে শিবালয়ের গোয়ারীয়া ও কাঠালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা।
 
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, এক সপ্তাহ ধরে টানাবর্ষণে উল্লাপাড়ার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রবল বৃষ্টির কারণে উল্লাপাড়ার কয়েকটি মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক ভেঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
 
বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের পাটধারী, রাণীনগর, চড়িয়া শিকা, হাটিকমুরুল গোলচত্বরে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় এবং রাস্তার পাশে ভেঙ্গে যাওয়ায় চরম ঝুঁকি নিয়ে এই পথে চলছে যানবাহন। একই অবস্থা উল্লাপাড়া-কৃষকগঞ্জ বাজার জিসি আঞ্চলিক সড়কের। বৃষ্টির পানিতে উল্লাপাড়ার সলপ, শ্রীকোলা, লাহিড়ীমোহনপুর, কয়ড়া, নলসোন্দা ও পঞ্চক্রোশী গ্রামের প্রায় ১০ হেক্টর জমির সবজি ডুবে গেছে।
 
নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
 
উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকাসহ নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে মাঠের আমন ধান ও বীজতলা এবং শাকসবজি ক্ষেত। ভেসে গেছে পুকুর ডোবা ও মত্স্য প্রজেক্টের মাছ। বৃষ্টির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ কাজের জন্য ঘর থেকে বের হতে না পারায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
 
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় আড়িয়াল খা  নদীর ভাঙ্গনে বিলীন
হয়ে গেছে একটি রাইস মিল, একটি স-মিল এবং দু’টি বসত ঘর। হুমকির মুখে রয়েছে উপজেলার চাদপাশা ইউনিয়নের রফিয়াদি এলাকার নদী তীরবর্তী শতাধিক পরিবার। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে আকস্মিকভাবে ভাঙ্গন শুরু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স-মিলের মালিক জসিম উদ্দিন সিকদার জানান, প্রতি বছরই তাকে ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়। আগে থেকে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানালেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা পারভীন ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
 
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানান, গত টানা ৫ দিনের ভারী বর্ষণে মহেশপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ, ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আমন বীজ তলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পটল, বেগুন, ঝিঙ্গাসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত। কাঁচা রাস্তা, কাঁচা ঘরবাড়ীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
 

নাগপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, টানা ভারী বর্ষণে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় সীমাহীন জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার অধিকাংশ কাঁচা-পাকা রাস্তা-ঘাট বৃষ্টির সে াতে ভেঙ্গে খানাখন্দকে পরিণত হয়ে চলাচলের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে।