সবুজের সমারোহ। এলাকার একমাত্র মুক্ত বায়ু সেবনের জায়গা। আশপাশের পাড়া-মহল্লার শিশুরা খেলাধুলা করতে আসে। আর বয়স্করা আসেন ব্যায়াম করতে। সুন্দর পরিবেশে বসে এলাকার লোকজন গল্প-গুজব করেন। বলা হচ্ছে শহীদ আনোয়ারা পার্কের কথা। ফার্মগেট পার্ক নামেই এটি পরিচিত।
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকার এই পার্কের দুই পাশে অন্যরকম জীবন। এখানে জীবন যেনো থমকে আছে। চারপাশে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। খুপরি ঘর বানিয়ে বসবাস করছে ভাসমান মানুষ। নুন আন্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা এই মানুষের। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কেটে যায় জীবন। অনাহারে কাটাতে হয় বেশির ভাগ দিন। তবে রাস্তার উল্টো পাশেই সুউচ্চ ভবনে অন্যরকম জীবনযাপন। ভোগ-বিলাসে কাটছে সেসব অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের দিনমান। রোদ-বৃষ্টি উঁচুতলার মানুষকে ছুঁতেও পারে না। আর প্রতিদিন দামি গাড়িতে করে এই পথেই যাতায়াত করেন অগণিত মানুষ। কে রাখে কার খবর! তবে জীবন তো চলেই যায়। সে অ্যাপার্টমেন্টের হোক আর ফুটপাতের হোক!
এই ফুটপাতে স্ত্রী নিয়ে থাকেন ছাত্তার মিয়া। স্ত্রী ছালেহা বাসায় বাসায় কাজ করেন। কথা হয় ছাত্তার মিয়ার সঙ্গে। কথা বলতে গিয়ে তিনি হারিয়ে যান অতীতে। এক আকাশ হতাশার সুরে বললেন, একসময় ছিল বৌ-ঝিদের হাসি তামাসা, উঠান ভরা ধান। রাত নেমে এলে কামলারা উঠানে বসতো, হেমন্তের রাতে কিচ্ছা-গানে তামাম রাত পার হতো। বেহুলা লকিন্দরের পালা চলতো। উঠানের খড় ভিজে যেতো শি?শিরে।
এমনি অনেক রাত কেটেছে ছাত্তার মিয়ার। অথচ আজ কিছুরই সুঘ্রান পান না পলিথিনের ঘরে শুইয়ে! নদী ভাঙনে ছাত্তার মিয়া আজ ফার্মগেটের ফুটপাতের বাসিন্দা। কেমন আছেন? জানতে চাইলে তার স্ত্রী ছালেহা বললেন, ‘এই তো ভালাই আছি বাবা।’ রমজানে সেহেরিতে কী খান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভাত দিয়া ভাত খাই’। কখনো কিছুই থাকে না। কখনো আবার যেই বাসায় কাজ করি সেখান থেকে কিছু তরকারি দেয়। এটা দিয়েই চলে যায়। তবে ইফতারিতে পথচারীরা অনেকেই দিয়ে যান কিছু না কিছু।
কথা হয় এই ফুটপাতের আরেক বাসিন্দা খাদিজার সঙ্গে। একটা সময় স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকতেন বরিশালের হিজলা উপজেলায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। সন্তানরাও আর তাকে দেখাশোনা করে না। শরীরে যতদিন শক্তি ছিল ততদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে জীবন চালিয়েছেন; কিন্তু বয়সের এই শেষ সীমায় এখন চলনশক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। হাঁটতে-চলতে না পারার কারণে ফার্মগেটের ফুটপাতের উপর পলিথিনে ঢাকা একটি ছোট্ট ঘরে বাস করেন তিনি। কিছুদিন আগে রাস্তার ছেলেরা তার পলিথিনের বেড়া ছিঁড়ে ফেললে হঠাত্ বর্ষার পানিতে ভিজতে হয় বলেও জানান তিনি।
এই শহীদ আনোয়ারা পার্ক এলাকাতে শতাধিক ভাসমান মানুষের বসবাস। তারা কাগজ কুড়িয়ে, রিকশা চালিয়ে, ভিক্ষা করে, আয়ার কাজ এবং হকারি করে সংসার চালায়। এখানে মায়ের কোল আলোকিত করে নতুন শিশুও জন্ম নেয়।
পার্কের ভেতরে বেঞ্চিতে বসা আরেক ভাসমান আরাফাতের কাছে জানা গেল, উন্মুক্ত আকাশের নিচে দিন-রাত কাটানোর কথা। ফুতপাতে মানুষের চলাচল থাকায় দিনের বেলায় তারা সেখানে ঘর করে থাকতে পারেন না। তাই সারাদিন রোদে পুড়তে হয়। রাতে পলিথিন দিয়ে ঘিরে শোবার ঘর করলেও বৃষ্টির সময় ভিজেই রাত কাটাতে হয় এসব অসহায় মানুষের। সামান্য পলিথিনে কি আর বৃষ্টি মানে বললেন আরাফাত!
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাজীব মীর। থাকেন ফার্মগেটের পাশেই ইন্দিরা রোডে। এই ভাসমান মানুষ নিয়ে তিনি বলেন, ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা মূলত শহরেই বেশি। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের শহরগুলো আধুনিক হচ্ছে সত্যি, সেই সঙ্গে বাড়ছে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাও। গ্রাম থেকে সর্বহারা মানুষের দল শহরে এসে হয়ে যাচ্ছে ছিন্নমূল।
তিনি আরো বলেন, এটার পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণেও অনেকেই ছিন্নমূল হয়ে শহরে পাড়ি জমায়। আগ্রাসী নদীর সর্বনাশা ছোবলে ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি ও ফসলী জমি এমনকি স্বজনদের হারিয়ে পরে ঠাঁই মিলে ‘ঢাকা’ নামক কংক্রিটের জঙ্গলে।
