তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোর্ট ফি জমা দেয়ার সুযোগ রেখে একটি আইনের খসড়ায় শর্ত সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯ সংশোধন করে প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান প্রণয়নের জন্যও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অনুশাসন দিয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি নতুন আইন করার প্রস্তাব করেছিল। এছাড়া মন্ত্রিসভা সরিষার তেল, চিনি, আখের গুড় এবং সারের মূসক অব্যাহতি প্রদান সংক্রান্ত আইন সংশোধন প্রস্তাব ও ক্যাডেট কলেজ আইন-২০১৫ অনুমোদন করেছে।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
দি কোর্ট ফিস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০১৫: দি কোর্ট ফিস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০১৫এর খসড়ায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া স্ট্যাম্প বেচাকেনা করলে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ অনুমোদনের কথা জানিয়ে বলেন, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের কোর্ট ফি আইনটি বেশ পুরনো, ১৮৭০ সালের। এর মধ্যে এটি সংশোধনও হয়েছে। কোর্ট ফি আইনে দুটি সংশোধন আনা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোর্ট ফি পরিশোধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ও বর্তমান মূল্য পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জরিমানার হার বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি কার্যকর হলে জনগণ ই-পেমেন্টের মাধ্যমে অনলাইনে কোর্ট ফি জমা দিতে পারবে। এতে কয়েকটি সুবিধা হবে। কোর্ট ফি ছাপানো, সংরক্ষণ করা ও পরিবহনের পেছনে যে বিশাল ব্যয় হয়, এটা কমবে। জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে। মানুষের অহেতুক ভোগান্তি অনেক কমবে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক্স ও ডিজিটাইজড লেনদেনের মাধ্যমে কোর্ট ফি জমা দেয়া যাবে। এজন্য সরকার বাণিজ্যিক ও তফসিলি ব্যাংক বা মোবাইল অপারেটর বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ/এজেন্টেকে নিয়োগ দিতে পারবে। রিফান্ড (টাকা ফেরত) প্রয়োজন হলে তাও ইলেকট্রোনিক্যালি করা যাবে। এ আইন বা আইনের অধীনে করা বিধিমালা লঙ্ঘনের জন্য কারাদণ্ড ৬ মাসই থাকছে, তবে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে স্ট্যাম্প জালিয়াতির জন্য এ আইনে শাস্তি নয়, এজন্য দণ্ডবিধি প্রযোজ্য হবে।
সরিষার তেল, চিনি, আখের গুড় এবং সারে মূসক অব্যাহতি: সরিষার তেল, চিনি, আখের গুড় এবং সারের মূসক অব্যাহতি দিয়ে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’ সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতির সীমা ২৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করার বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধনীতে মূসক আইনে মূসক অব্যাহতির সীমা ২৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত দুই ধরনের পণ্য মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সরিষার তেল, চিনি, আখের গুড় এবং সারের মূসক অব্যাহতি করার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যেমন- ইনসুলিকন ও ইনসুলিক এর লবণ, জন্মনিরোধোক ইনসুলিন, ক্যান্সারনিরোধক ওষুধ, কিডনি ডায়ালাইসিস সলিউশন ও ফাস্ট এইড বক্স এর সরবরাহ ও আমদানিতে মূসক অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে সংশোধিত আইনে।
ক্যাডেট কলেজ আইন অনুমোদন: মন্ত্রিসভা দি ক্যাডেট কলেজ (এ্যামেন্ডমেন্ট) এ্যাক্ট ২০১৫ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। ক্যাডেট কলেজ পরিচালনার জন্য মূল অর্ডিন্যান্সটি ১৯৬৪ সালের জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে অর্ডিন্যান্সটি সংশোধিত হয়। সামরিক শাসনামলে সংশোধন হওয়ায় সেগুলো একত্রিত করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংশোধনী আইন মন্ত্রিসভায় নিয়ে এসেছে। এতে মূল আইনের তেমন কোনো পরিবর্তন নেই জানিয়ে মোশাররাফ হোসাইন বলেন, ক্যাডেট কলেজ পরিচালনার জন্য একটি কাউন্সিল আছে। কাউন্সিলের সদস্যদের পদবি পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সংশোধিত আইনে পদবিগুলো হালনাগাদ করে দেয়া হবে।
মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন: ১৯৯৯ সালের এই আইন বাতিল করে নতুন আইন করার প্রস্তাব অনুমোদন করেনি মন্ত্রিসভা। প্রয়োজনে আগের আইনে সংশোধন-সংযোজন করে সংশোধিত আকারে আইন করার কথা বলা হয়। মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯’-এর আওতায় বর্তমানে মানবদেহে অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা হয়। এ আইন থাকার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবৈধভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ২০১১ সালে হাইকোর্ট নির্দেশনা দেয় যে, আইনটি প্রয়োগ যথাযথভাবে করা হচ্ছে না। সে কারণে এ আইনের আওতায় বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়ন করে আইনটি যথাযথ কার্যকর করা প্রয়োজন। সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিধিমালা প্রণয়ন করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
আইন মন্ত্রণালয় জানায়, এখানে অনেক মৌলিক বিষয় রয়েছে যেগুলো আইনে থাকা উচিত, এরপর মন্ত্রণালয় নতুন একটি আইন করে মন্ত্রিসভায় পাঠায়। আইনে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনে বিভিন্ন সংজ্ঞা, জীবিত ও মৃত ব্যক্তির অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ দানের পদ্ধতি, অঙ্গদাতা ও গ্রহণকারীর যোগ্যতা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় বলা হয়েছে। মন্ত্রিসভা খসড়া আইনটি নীতিগত অনুমোদন দিলেও কিছু অনুশাসন দিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভা বলেছে, আগের আইনটি খুব বেশি পুরনো নয়। যে সমস্ত নতুন বিষয় তারা নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে চান সেগুলো আগের আইনে যুক্ত করে আইনটি সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পদ্ধতিগত বা প্রয়োগিক বিষয়গুলো নিয়ে করা হবে বিধিমালা। তিনি বলেন, চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আইনটি ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন (সংশোধন) আইন, ২০১৫’ নামে নিয়ে আসবেন।
