আদমজী জুট মিল বন্ধের ১৩ বছর পূর্ণ হলো গতকাল । ২০০২ সালের ৩০ জুন অব্যাহত লোকসানের অজুহাতে এশিয়ার বৃহত্তম এই পাটকলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। থেমে যায় মিলের কর্মকাণ্ড, বন্ধ হয়ে যায় যন্ত্রপাতি, বেকার হয়ে পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। প্রায় ৪ বছর পর বন্ধ হওয়া আদমজী জুট মিল এলাকাটিকে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় রূপান্তর করা হয়, যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় ২০০৬ সালের ৬ মার্চ।
বর্তমানে আবারো কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পাঞ্চলটিতে। আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (এইপিজেড) প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। আদমজী ইপিজেডের সব প্লটে কারখানা চালু হলে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করার সুুযোগ পাবে।
আদমজী ইপিজেড
ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ১৫ কিলোমিটার এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী ইপিজেড। ২৯২ দশমিক ৬২ একর জমির ওপর স্থাপিত আদমজী ইপিজেডের ৩০৭টি প্লটের মধ্যে ৬৮টি দেশি-বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দেশি ১৬টি, বিদেশি ৩৪টি এবং যৌথ শিল্প প্রতিষ্ঠান ১৮টি। ৫৪টি প্লটে প্রতিষ্ঠান নির্মাণাধীন রয়েছে। বর্তমানে চালু ৩৮টি কারখানায় গার্মেন্টস, জিপার, কার্টন, হ্যাঙ্গার, লেভেল, ট্যাগ, জুতা, সোয়েটার, টেক্সটাইল ও ডায়িংসহ ১০০ শতাংশ রপ্তানিযোগ্য পণ্য সামগ্রী তৈরি করা হয়ে থাকে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ৩৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। এর মধ্যে বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। তবে বর্তমানে আরো ১২ থেকে ১৫ হাজার শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে এই ইপিজেডে। আদমজী ইপিজেড থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। হংকং, কানাডা, জার্মানি, ইউইএ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারত, কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ এই ইপিজেডে বিনিয়োগ করেছে।
আদমজীর যাত্রা শুরু যেভাবে
পূর্ব পাকিস্তানের ২২ পরিবারের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই ওয়াহেদ আদমজী ওরফে দাউদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী এবং গুল মোহাম্মদ যৌথভাবে ১৯৫০ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ২৯৭ একর জমিতে আদমজী জুট মিলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর ১৭শ হেসিয়ান এবং ১ হাজার সেকিং লুম দিয়ে এই মিলের উত্পাদন শুরু হয়। তখন প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত আদমজী জুট মিলে প্রতিদিন গড়ে ২৮৮ টন পাটের চট উত্পাদন হতো। ওই সময় মিলের উত্পাদন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। আদমজী জুট মিল পরিণত হয় এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহত্ কারখানায়। মিলটিতে ২৪ হাজার ৯১৬ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি করতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত মিলটি ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির এক আদেশে দেশের অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে আদমজী জুট মিলকেও জাতীয়করণ করে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশনকে (বিজেএমসি)। এই মিলে ২০০০ সাল পর্যন্ত লোকসান হয় সাড়ে ১২শ কোটি টাকা। তত্কালীন চারদলীয় জোট তথা বিএনপি সরকার ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেয়।
১৩ বছরেও আদমজীর ২নং মিলটি চালু হয়নি
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আদমজীর ২নং জুটমিলটি চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু গত সাড়ে ৭ বছরেও এটা চালু করা সম্ভব হয়নি। অথচ ২নং মিলটি পুনঃস্থাপনের সুযোগ আছে উল্লেখ করে তিনটি প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি প্রস্তাব ছিল ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রূপে আদমজী ২নং ইউনিটটি চালু করা হলে প্রতি শিফটে ১ হাজার ৭১৬ জন করে দুই শিফটে ৩ হাজার ৪৩২ জনের কর্মসংস্থান হবে এবং প্রতিদিন ৫০.৭০ টন পাটজাত পণ্য উত্পাদন হবে। এ মিলটি চালুর আশায় আদমজী জুট মিলের সাবেক শ্রমিকরা অপেক্ষা করছে। কবে মিল চালু হবে। তাদের কর্মসংস্থান হবে।