অনুমোদনহীন বা অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ বন্ধে অর্থবছরের শুরুতেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বাজেট পাসের পরই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠনকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। সকর্তবার্তা পাঠানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও। অর্থবছরের শুরুর দিন অর্থাত্ ১ জুলাই বুধবার রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জরিমানা ও শাস্তির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে অনুমোদনহীন বিদেশি নাগরিক নিয়োগ না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজেটে অনুমোদনহীন বিদেশি নিয়োগের দায়ে দায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ বা কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আরোপ করা হয়। সেই সঙ্গে, ওই প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্ত কর অব্যাহতি, কর অবকাশ সুবিধাও বাতিল হবে। এ সতর্কবার্তা জানিয়ে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি, ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার (ফিকি), মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ (এমসিসিসিআই) বেশকিছু ব্যবসায়ী সংগঠনকে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআর। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক অনুমোদনহীন বিদেশি চাকরি করছেন। এটি ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের চাইলেই খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগ না দিলে তাদের পক্ষে এদেশে অবৈধভাবে টিকে থাকা কঠিন হবে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাস্তির আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছিল। নতুন শাস্তির বিধানে আশা করি অনুমোদনহীন বিদেশিদের নিয়োগ দেয়ার সাহস করবে না। তাদের এ সতর্কবার্তাই স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো।
বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হলে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বৈধভাবে কাজ করে এমন বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১২ হাজারের কিছু বেশি। এর বাইরে বেপজা (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা) কর্তৃপক্ষ ও এনজিও ব্যুরোরও নিজ নিজ খাতে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেপজা’র অনুমোদিত সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার আর এনজিও ব্যুরোর অনুমোদিত বিদেশি নাগরিক প্রায় ৫শ’। বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কাজ করেন এমন বিদেশি নাগরিককে তাদের যে কোন পরিমাণ আয়ের উপর ৩০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হয়। একটানা তিন মাস বাংলাদেশে থাকলে বা এক বছরে ১৮০ দিন এ দেশে থাকলে তারা আয়করের আওতায় পড়বেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কর ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যম পর্যায় বা শীর্ষ পদে চাকরি করছেন। বছরে এক একজন বিদেশি নাগরিক গড়ে ১ থেকে দেড় কোটি টাকা আয় করলেও তারা কোন কর দিচ্ছেন না। বরং অবৈধ পথে এসব টাকা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্ষতি হচ্ছে দেশের অর্থনীতির। সাধারণত ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ, পর্যটক, বেসরকারি সংস্থাসহ নানা উপায়ে বাংলাদেশে এসে আর ফেরত যান না। বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ২ লাখ বলা হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে এ প্রকৃত তথ্য নেই।
বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারত, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ডেনমার্ক ও স্পেনের বিদেশি কর্মীরা শিল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের জন্য ভিসা নিয়ে বিদেশি এসব নাগরিক এদেশে এলেও মেয়াদ শেষে তাদের বড় অংশই নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন না। নতুন করে ভিসার জন্য আবেদনও করছেন না। আবার ঠিকানা পরিবর্তন করায় এসব বিদেশিকে খুঁজেও পাচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম খাত, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট, এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন এসব বিদেশিরা।