বিচার বিভাগ নিয়ে সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সকলকে সংযত ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। তিনি বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করার পূর্বে আপনাদের সংযত থাকা উচিত। বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। বিশেষ করে আপনাদের (রাজনীতিবিদ) উচিত বিচার বিভাগকে সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা। রবিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মামলার শুনানিকালে তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। এ পর্যায়ে খন্দকার মাহবুব বলেন, আপনারা সংবিধানের অভিভাবক। আমরা সর্বোচ্চ আদালতকে সম্মান করি। কিন্তু নিম্ন আদালত কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা স্বাধীন নয়। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আর এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই নিম্ন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকলে সেটি বলতে পারেন। কিন্তু আপনারা যারা রাজনীতি করেন তারা ঢালাওভাবে এরকম রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন বলেই আপনি এখানে এসব কথা বলতে পারছেন। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর নিম্ন আদালত সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাই আপনার এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তি নেই। আমি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচারক ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অভিযোগের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেছি। কারো কোন অভিযোগ থাকলে সেই বাক্সে ফেলার জন্য সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বিচারপ্রার্থী জনগণকে বলা হয়েছে। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন কোন বিচারক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি লাগাম টেনে ধরেছি। আমি কোনো রাখঢাক রাখি না।
খন্দকার মাহবুব বলেন, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। আপনার বিভিন্ন বক্তব্য দেখে আমরা আশাবাদী যে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় অতীতে বিচার বিভাগের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়নি। সে কারণে অতীতে অনেক ঘটনা ঘটেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, জামিন না হলেও যখন গোটা বিচার বিভাগ নিয়ে কথা বলেন, তখনই খারাপ লাগে। বিচার বিভাগ নিয়ে মন্তব্য করার পূর্বে আপনাদের আরো সংযত ও সচেতন হওয়া উচিত। কারণ আমাদের হাত বাধা নয়। অযাচিত ও মানহানিকর বক্তব্য দেয়া হলে ব্যবস্থা নিতে কোনো কুণ্ঠাবোধ করবো না। এখনও না, পরেও না।
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘প্রধান বিচারপতি যেটা বলতে চেয়েছেন তা হলো, বিচার বিভাগ সম্পর্কে যদি অযাচিত মানহানিকর বক্তব্য দেয়া হয় সেক্ষেত্রে বিচার বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। বিচার বিভাগের হাত এতো খাটো না যে এ ধরনের অহেতুক বক্তব্য সব সময় হজম করবে। প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে বিচার বিভাগের হাত অনেক লম্বা।” তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বলেছেন বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সবার প্রতি সমান আচরণ করে যাচ্ছেন। তারপরেও কিছু কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিচার বিভাগ নিয়ে যে সমস্ত মন্তব্য করেন তা খুবই দুঃখজনক। কোনো আদেশ যখন তাদের বিরুদ্ধে যায় তখন তারা বিরূপ মন্তব্য শুরু করে। এটি নিয়ে প্রধান বিচারপতি উস্মা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রধান বিচারপতি অহেতুক মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে সব মহলকে অনুরোধ করেছেন।
পুলিশের তদন্তে মারাত্মক ত্রুটি
মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের মারাত্মক ত্রুটি থাকে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, মামলার তদন্তের জন্য পুলিশ অফিসারদের ট্রেনিং দরকার। তাদের টেকনিক্যাল কিছু বিষয় শিখাতে হবে।’ গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘সাম্প্রতিক মানবপাচার পরিস্থিতি এবং সমস্যা উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি অত্যন্ত মর্মাহত হই, যখন দেখি কোনো ব্যক্তি উচ্চ আদালত থেকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও সে শাস্তি ভোগ করে না।
তিনি বলেন, মানবপাচারের মামলায় দোষীদের শাস্তি না হওয়ার পেছনে কারণ হলো-রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ত্রুটি। এখানে অনেক সংসদ সদস্য আছেন, আপনারা নিজ জেলায় কেমন পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করেন, আপনারা দলীয় লোক নিয়োগ দেন, যারা সিআরপিসির সিও জানে না। আইনজীবীরা টাকার দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় আইনের দিকে লক্ষ্য করেন না বলেও অভিযোগ প্রধান বিচারপতির।
তিনি বলেন, তদন্ত ও প্রসিকিউশনের সমস্যা থাকলে মামলা যতই ভাল হোক না কেন, তার কোনো ফলাফল আসবে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এমপি ও মন্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা আইনগুলো খুব চিন্তা-চেতনা না করেই তৈরি করেন। ফলে আইন তৈরির ১-২ মাসের মধ্যেই সংশোধন করতে হয়।’
তিনি বলেন, আইন করতে হলে সচেতন থাকা দরকার। তা না হলে আইনে ত্রুটি ও ফাঁক থেকে যায়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, সরকারের কাছে দাবি উঠলেই আইন তৈরি করা হয়। আইনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে কোন বিচারক বিচার করবেন তা ঠিক করেন কিন্তু পর্যাপ্ত বিচারক আছে কি-না তা দেখেন না।
তিনি বলেন, আইন করার সময় আদালত গঠনের বিষয়ে কমপক্ষে প্রধান বিচারপতির মতামত নেয়া দরকার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, মানবপাচার রোধে সরকারের উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় কিন্তু তা বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান নিন্দনীয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, মানবপাচারের অভিযোগে গত ১০ বছরে ৫৬৮টি মামলা হয়েছে। পাচার বন্ধে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, ডা. দীপু মনি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোজাম্মেল হক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াসহ বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।