জঙ্গি আতঙ্কে অস্ট্রেলিয়া

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৫, ০১:৪৪

আত্মপ্রকাশের পর থেকেই ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন (আইএস) দিন দিন যেন আরো বেশি বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। আইএসের হামলায় এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মূলত ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার জন্য ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের যাত্রা শুরু হলেও তা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশসহ অনেক দেশের জন্য। আইএস আতঙ্ক থেকে বাদ যায়নি অস্ট্রেলিয়াও। দেশটির প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোটের জন্য রীতিমতো মাথা ব্যথার কারণে পরিণত হয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি। টনি অ্যাবোটের কাছে মনে হয়, আধুনিক যুগের ভৌতিক সিনেমার মতো এটাও এগিয়ে আসছে তাদের দিকে, কখন যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করে। কারণ ইতিমধ্যে ইরাক-সিরিয়ার ভূখণ্ড ছাড়িয়ে আইএস হামলা চালিয়েছে কুয়েত, ফ্রান্স ও তিউনিশিয়ায়। কখন যে অস্ট্রেলিয়া এই হামলার শিকার হয় সেই ভয়েই বিচলিত টনি অ্যাবোট। প্রধানমন্ত্রীর এমন আশঙ্কাই প্রমাণ করে অস্ট্রেলিয়া কতোটা আতঙ্কিত।

 
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী লোয়ি ইন্সটিটিউটের এক গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে দেশটির সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কথা। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সেখানকার মানুষের কাছে বর্তমান সময়টাকে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সময় মনে হয়। এই সময়টিতে বেশিরভাগ মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তার জন্য আইএসকে মারাত্মক হুমকি হিসাবে বিবেচনা করেন দেশটির শতকরা ৬৯ জন মানুষ।
 
অস্ট্রেলিয়ার মানুষ আইএসের আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও তা শাপেবর হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য। এবছরের শুরুর দিকেই মনে হচ্ছিলো মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই হয়তো নির্বাচন দিতে বাধ্য হবেন টনি অ্যাবোট। তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো দলের মধ্য থেকেই। অ্যাবোটের ভাগ্যাকাশে যে কালো মেঘ জমেছিলো, তা কেটে গিয়ে এখন ঝকঝকে রোদ্দুর। আইএস দমনের ঘোষণা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গৃহীত পদক্ষেপই যেন তার অবস্থানকে দিন দিন পাকাপোক্ত করছে। অস্ট্রেলিয়ার মানুষের মনের এই ভয় দূর করতে সরকারের পদক্ষেপই তাদের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ায়। অ্যাবোট যেন সোনালী বন্দুক হাতে পেয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা আর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে কাবু করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও। বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দরাও অ্যাবোটের বিরোধিতা বন্ধ করে তার নেতৃত্বের প্রতি নতিস্বীকারে বাধ্য হচ্ছে।
 
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মাঝে যোগ হয়ে নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি কিংবা সন্ত্রাস দমনের জন্যই শুধু জাতীয় নিরাপত্তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে না বরং তা রাজনৈতিক জনসমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রেই বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের আইনের নামেও সরকার বিরোধীদের নানাভাবে নাজেহাল করা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আইএসের হুমকির ভয় দেখিয়ে সরকার চাইছে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে। এর মধ্য দিয়ে সেখানকার মানুষের নাগরিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। মানুষের মন থেকে ঐ ভয়টা কেটে গেলে তখন কী হবে তা কি তিনি ভেবে দেখেছেন? 
 

পশ্চিমা দেশগুলোর সুরে সুর মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন, আইএসে যোগ দেয়া কিংবা যোগ দিতে ইচ্ছুক বিদেশি যোদ্ধাদের কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে গোটা দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো তার দেশে এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা সংস্থার হিসাব মতে দেড়শ’ থেকে আড়াইশ’ মানুষ আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে দেশত্যাগ করেছে। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, প্রকৃত সংখ্যা অনেক কম হবে। তাদের মতে, এই তালিকায় মাত্র ৫৪ জন থাকতে পারে। অর্থাত্ প্রকৃত সংখ্যা থেকে প্রায় পাঁচগুণ বেশি দেখানো হচ্ছে। পাঁচগুণ বেশি মানুষের আইএসের হয়ে যুদ্ধ করার যে তথ্য পাওয়া গেছে তা প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করে না। অস্ট্রেলিয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন বেশ আলোচনা সৃষ্টি করেছে। আইএসের সাথে যুদ্ধ      করতে দেশ ছাড়াদের নাগরিকত্বের প্রশ্নেও কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন অ্যাবোট। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এভাবে মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করে কতোটা জনসমর্থন আদায় করতে পারবে অ্যাবোটের সরকার। এই বিষয়টাকে কাজে লাগিয়ে তিনি কি পারবেন নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে। মানুষের নিরাপত্তার কথা বলে অ্যাবোট যে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তা-ই কিনা অ্যাবোটের জন্য কাল না হয়ে দাঁড়ায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।