ইরানের সঙ্গে বিশ্ব শক্তির ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৫, ০০:০৬

দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের আলোচনা এবং সর্বশেষ ১৮ দিনের ম্যারাথন বৈঠকের পর অবশেষে ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তি করতে সক্ষম হলো যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ছয় বিশ্ব শক্তি। গতকাল মঙ্গলবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এক সংবাদ সম্মেলনে দুই পক্ষই এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

চুক্তির বিনিময়ে বিশ্ব শক্তি ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অবরোধ পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করবে। চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের কূটনীতিক জয় পেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং এর ফলে বিশ্ব শান্তির আরো অগ্রগতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে ইসরাইল এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, এটি ‘ঐতিহাসিক খারাপ’ চুক্তি। এদিকে চুক্তির খবর প্রকাশ হওয়ার পর গতকাল বিশ্ব বাজারে তেলের দাম পড়ে যায়। খবর বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমসের।

 
দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল :গতকাল ভিয়েনায় পরমাণু শক্তিধর পাঁচ দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন এবং জার্মানির সঙ্গে সমঝোতায় আসে ইরান। এর আগে সোমবার রাতে আইএইএ’র সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ইরানের। ২০০৬ সাল থেকে একটি চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তি করার জন্য আলোচনা শুরু হয়। আর মূল আলোচনা শুরু হয় গত ২০ মাস আগে। গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্ব অভিযোগ করে আসছে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ইরান তা বরাবরই অস্বীকার করছে। চুক্তি করতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। গত এপ্রিলে সুইজারল্যান্ডের লুসানে একটি খসড়া চুক্তি করা হয়। এরপর গত ৩০ জুন চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তিন দফায় সময় বাড়ানো হয়। কিছু জটিল ইস্যুতে মতবিরোধ ছিল উভয় পক্ষের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, চুক্তির জন্য যেসব বাধা ছিল সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসা সম্ভব হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই ইরানিয়ান কূটনীতিক জানান, মঙ্গলবার সকালেই চুক্তিতে পৌঁছান তারা।
 
কি আছে সমঝোতায়
 
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চুক্তির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮০-এর অধিক। তবে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ১৫৯ পৃষ্ঠার চুক্তি। এই চুক্তিতে আছে- (১) জাতিসংঘের পরমাণু বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি বা আইএইএ’র পরিদর্শকরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করতে পারবেন। তবে সেটা পুরোপুরি অবাধ হবে না। দেশটি পরিদর্শনের অনুরোধ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। (২) ইরান যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে তাহলে একটি যৌথ কমিশন গঠিত হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমাধান করতে হবে। কমিশন যদি সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তাহলে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উঠবে। এতে ইরানের ওপর পুনরায় অবরোধ করা যাবে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ৬৫ দিনের মধ্যে। (৩) ইরান যদি চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মেনে চলে তাহলে দেশটির ওপর অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত জাতিসংঘের যে নিষেধাজ্ঞা আছে তা যথাক্রমে ৫ বছর এবং ৮ বছর পর প্রত্যাহার হবে। (৪) ইরানের তেল, গ্যাস, আর্থিক লেনদেন, বিমান ও জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া ইরানের যেসব অর্থ এবং সম্পদ জব্দ করা আছে সেগুলো ইরান ফিরে পাবে। (৫) পনের বছর পর্যন্ত পরমাণু জ্বালানি রাখার পরিমাণ, সেন্ট্রিফিউজসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশের উন্নয়ন, পরমাণু চুল্লির নকশা এবং ফর্ডো পরমাণু কেন্দ্রের আন্ডারগ্রাউন্ডের উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রে ইরানকে একটা সীমারেখা বেঁধে দেয়া হয়েছে। ইরান সেন্ট্রিফিউজ দুই-তৃতীয়াংশ (৫০৬০) হ্রাস করবে। বর্তমানে ইরানের কাছে যে ইউরেনিয়াম আছে তা থেকে ৯৮ শতাংশ কমিয়ে ৩শ কেজিতে নামিয়ে আনতে হবে। (৬) আর্ক স্থাপনাটি পুরোপুরি বাদ দিতে এবং নতুন করে এর নকশা তৈরি করতে হবে। এর ফলে এই কেন্দ্রের আন্ডারগ্রাউন্ডে প্লুটোনিয়াম উত্পাদন অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে। ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই আন্ডারগ্রাউন্ডের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। (৭) দশ বছর পর ইরানের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। ১৫ বছর পর ইরান পরমাণু অস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ ইউরেনিয়াম উত্পাদন এবং এর উন্নয়ন ঘটাতে পারবে কোনো বাধা ছাড়াই। তবে ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (নন-প্রোলিফারেশন নিউক্লিয়ার ট্রিটি বা এনপিটি) স্বাক্ষর করায় শেষ পদক্ষেপ হিসেবে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। এই চুক্তিতে ইরানের সবচেয়ে উন্নত পরমাণু স্থাপনা বন্ধ হবে না।
 
ইরান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব
 
বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর দাবি মেনে নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি কাটছাঁট করতে রাজি হয় ইরান। বিশেষ করে যেসব কাজ সরাসরি পরমাণু বোমা তৈরির সঙ্গে জড়িত। এর পুরস্কার হিসেবে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে এর বাজার এবং মানব সম্পদের দরজা খুলে যাবে। তেলের জোগান বাড়বে বিশ্ব বাজারে। অর্থনীতির নিয়ম মেনে কমে যাবে তেলের দাম। গতকালই বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমে যায়। এমনকি সমঝোতার আভাস পাওয়ার কারণেই গত কয়েকদিন ধরে তেলের বাজার নিম্নমুখী ছিল। ইরান বিশ্বের তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। অবরোধ থাকার কারণে তাদের তেল বাইরের দেশে বিক্রি সম্ভব ছিল না। অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়েও ছিল বাধা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নত হবে। পরিবর্তন আসতে পারে ইরানের রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায়ও।
 
বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
 
চুক্তি হওয়ার পর গতকাল সকালে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে এই চুক্তি হয়নি। এর প্রমাণ হবে কাজের মাধ্যমে। এই পদক্ষেপ বিশ্বকে আরো অধিক নিরাপদ করবে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সব পথ বন্ধ হলো। পরিদর্শকরা চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন বলেও জানান তিনি। তার এই প্রতিক্রিয়া ইরানের টেলিভিশনগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ওবামার বক্তব্য শেষ হলে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্থাপনে এই চুক্তি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ইরানি জনগণের প্রার্থনা বাস্তবে রূপ পেল। রুহানি বলেন, অবরোধের শাসনামল কখনো দেশের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনতে পারে না। এটা কেবল জনগণকে কষ্টই দেয়।
 
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডেমোক্র্যাট দলের আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে অন্যান্য খারাপ দিকগুলো থেকেও ইরানকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার জন বোয়েনার বলেন, এটা একটা খারাপ চুক্তি। চুক্তির পরই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার মন্ত্রী পরিষদের নিরাপত্তা বিভাগের বৈঠক ডেকেছেন। এর আগে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি একটা ঐতিহাসিক খারাপ চুক্তি এবং ঐতিহাসিক ভুল। এটি ইরানকে এই অঞ্চলে আরো শক্তিশালী করে তুলবে। ইইউ’র পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মঘেরিনি বলেছেন, সারা বিশ্বের জন্য এটা একটা আশার প্রতীক হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেছেন, এটা একটা ঐতিহাসিক চুক্তি এবং আশার নতুন অধ্যায় খুলে দেবে। তিনি বলেন, কোনো পক্ষের  জন্যই এই চুক্তি পরিপূর্ণ স্বস্তি বয়ে আনতে পারবে না। কিন্তু চুক্তিতে যে অবশেষে পৌঁছানো গেছে সেটাই একটা বড় সাফল্য।
 
ওবামার কূটনৈতিক জয়
 

প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই মেয়াদের শাসনামলে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিকে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্বের তিন দেশ কিউবা, ইরান এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিক্ত সম্পর্ক বা শীতল সম্পর্ক বিদ্যমান বহু বছর ধরে। কৌশলগতভাবে এই তিন দেশের মধ্যে ইরানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। কারণ এই দেশটি পরমাণু অস্ত্রের সঙ্গে জড়িত। সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে ভিয়েতনামের সঙ্গেও। চুক্তি হলেও ইরানের সবচেয়ে উন্নত পরমাণু স্থাপনা বন্ধ হবে না। এই ইস্যুটি নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন ওবামা। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি হলে তাতে বাধা দেবে বলে আগেই হুমকি দিয়েছিল কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা। কংগ্রেস এখন এই চুক্তি গ্রহণ করবে না কি প্রত্যাখ্যান করবে সেজন্য ৬০ দিন সময় পাবে। যদিও ওবামাও আগেই বলে দিয়েছেন, কংগ্রেস চুক্তি প্রত্যাখ্যানের কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে তিনি তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তি কেবলই সময়ের বিলম্ব ঘটাবে। ইরান ঠিকই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে। এটা একটা রাজনৈতিক চুক্তি। বাধ্যবাধকতার কোনো চুক্তি নয়।