আমার গানের শুরুর গল্পটা খানিকটা অন্যরকম। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমার পরিবার অনুরোধের আসর শুনতো। এখনকার মতো তখন এত অ্যালবাম বের হতো না। রেডিও ছিল গান শোনার প্রধান মাধ্যম। সেখানে বিভিন্ন দিন বিভিন্ন ধরণ ও শিল্পীর গান হতো। পরিবারের অনেকে বসে সেই গানের কথাগুলো লিখে রাখতেন। ফুফু হয়তো গানের মুখ লিখছে, বোন অন্তরা লিখছে, আরেক ফুপু হয়তো সেকেন্ড অন্তরা লিখছে। ওদিকে গান চলছে, হয়তো শেষ লাইন লিখতে পারেনি। হয়তো পরের সপ্তাহে গানটা বাজায়নি, এরপর একমাস পর হয়তো গানটা বাজিয়েছে তখন শেষ লাইনটা লিখছে। এমন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমার গানের প্রতি ভালোবাসা শুরু। পরিপক্ক গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পীর গান শুনতে শুনতে আমার বেড়ে ওঠা। আমার প্রথম হিট গান সেটাতেও যদি দেখা হয় ‘তোর রিনিঝিনি কাঁকনের ছন্দ, নির্ঘুম স্বপ্নে বাজে রে, আর নন্দিত বাঁধনের শিহরন, দু’চোখের জানালায় বাজে রে..’ একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ‘তোরে বুকেরই কারাগারে চিরদিন’ এমন কথার গান করেছি। প্রথম থেকে এইসব বিষয়ে একটু চুজি ছিলাম। শব্দের ব্যবহার, বিষয়বস্তুর ব্যবহার, উপমা, কাব্য-সাহিত্য নির্ভর গানের প্রতি আমার টান ছিল। এখন ভাবি এইগুলো কী সব উঠে গেল! নাকি মনে করছে সবকিছ লেখা হয়ে গেছে, আর কী লিখবো সুর করবো গাইবো। এখনও গানের কথা, সুর, গায়কীর বিষয়ে অনেক ভাবি। মাঝে মাঝে মনে হয় কাব্যময়তার দিন কি শেষ হয়ে গেল?
গানের সাথে সখ্যর বয়সটা অনেক বছর হয়ে গেল। গানের উদ্দেশেই প্রথম ঢাকায়, ১৯৮২ সালে। তখন আমি একটি হোস্টেলে থাকতাম। একটা ছেলে থাকতো আমার সাথে। শাজাহান নাম তার। মেট্টো পলিটন হোস্টেলে থাকতাম তখন। সে আমার গানের সব কাজ দেখাশোনা করতো। ঢাকায় এসেই কিছুদিনের মধ্যে মিউজিকের একটি সার্কেল গড়ে ওঠে। আমার বন্ধুর সার্কেলটা অনেক বড়। এমন অনেকেই আমার বন্ধু, যারা মিউজিক পছন্দ করে কিন্তু মিউজিকের কোনোকিছুই সে বাজাতে জানে না। আমাদের সাথে বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে যেত। দেখা গেল অনুষ্ঠান শেষে ড্রামটা মাথায় করে নিয়ে বাসায় পৌঁচ্ছে দিচ্ছে। সারাক্ষণ আমাদের সাথেই থাকতো। বিভিন পর্যায়ে বিভিন্ন মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হয় আমার। অনেকের সাথে কাজের মধ্য দিয়ে পরিচয়, এক সময় সেই সম্পর্ক থেকে বন্ধুত্ব। দিন দিন বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে।
এদের মধ্যে রয়েছে হ্যাপী আখন্দ, শেখ ইশতিয়াক, খালিদ হাসান মিলু। তাদের তিনজনই এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তাদের অনেক স্মৃতি বুকের মাঝখানে জমা হয়ে আছে। এই তিনজনের সাথে আমার গভীর সখ্য ছিল। তাদের তিনজনের সাথে আশির দশকে বন্ধুত্ব হয়। কেমন করে যেন একটা বন্ধনে জড়িয়ে যায়। যেকোনো উত্সবে-পার্বনে দুঃখ-বেদনা সবকিছু খালিদ হাসান মিলুর সাথে শেয়ার হতো। ভাবী এখনও বলেন, ‘আপনাকে রোজার ঈদ আর কোরবানীর ঈদে দেখিনি মনে পড়ে না।’ এই দু’টো ঈদ আমরা মিস করতাম না। ফরিদ আহমেদ (মামা), রিটন অধিকারী রিন্টু তিনজন মিলে প্রতি ঈদে আমরা মিলুর বাসায় যেতাম। কোনো ঈদ বাদ গেছে বলে আমার মনে পড়ে না।
ঢাকায় আসার পর অনেক জায়াগায় আড্ডা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আড্ডা দিতে খুব বেশি বাইরে যেতে হতো না। কারণ আমার বাসাটায় ছিল একটা আড্ডাখানা। আমার জানা মতে ঢাকা শহরে আমার বাসার আড্ডার মতো এত বড় মিউজিক্যাল আড্ডা আর কোথাও বসতো কি-না আমার জানা নেই। জায়গাটা ছিল একটা সরাইখানার মতো। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, এন্ড্রু কিশোর, খালিদ হাসান মিলু, হানিফ সংকেত, শুভ্র দেব, শেখ ইশতিয়াকসহ আমার সমসাময়িক সবাই এই আড্ডায় আসতো। রান্না হচ্ছে, খাওয়া হচ্ছে। যার রেকর্ডিং সে চলে যাচ্ছে, কাজ শেষ করে আবার আড্ডায় যোগ দিচ্ছে। আমার কাজ থাকলে আমি চলে যাচ্ছি। কার বাড়ি-ঘর সেটা বড় কথা নয়, এটা আমাদের সবার বাড়ি-ঘর। আড্ডায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হতো। যেমন এন্ড্রু কিশোর একটা বাজে গান করলো, আমার সাথে দেখা হলে বলতাম, ‘এই গানটা না করলে পারতেন।’ তখন তিনি বলতেন, ‘বোঝো না, ঘর ভাড়া, খাওয়ার খরচ চালাতে হবে না।’ আমি একটা খারাপ গান করলে অন্যজন বলতো না গাইলেই পারতেন। হয়তো সে রাতে আমার ঘুমই হতো না, সারারাত কেঁদে কাটিয়ে দিতাম। এমন অনেক গান গেয়েছি অনেকের অনুরোধে, কারণ বাঘা বাঘা মানুষদের তো না করতে পারিনি।
শুধু গানের মানুষদের সাথেই না, এর বাইরেও অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। এরমধ্যে একজনের কথা না বললেই নয়, তিনি চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল।
একটা মাত্র মানুষ আমাকে ভীষণ পছন্দ করতো। কেন করতো সেটা আমি জানি না। আলাউদ্দিন আলী ভাইয়ের সুরে জাফর ইকবালের অভিনীত ছবির মাধ্যমে আমার প্লেব্যাকের শুরু। জাফর বলতো আমার গান ছাড়া অন্য কারও কণ্ঠে লিপ দেবে না। ওর প্রযোজিত প্রথম সিনেমা ‘প্রেমিক’-এ আমাকে অভিনয় করানোর খুব শখ ছিল। খুব কষ্ট পেয়েছে কিন্তু আমি রাজী হইনি। এই কারণে বন্ধুত্ব-সখ্য একটুও কমেনি। কলকাতায় গেলাম গানের কাজে, কাজ শেষে যেদিন এসেছি সেদিনই বিকেলে আমার বাসায় এলো। এসেই দোস্ত বলেই ধুম করে একটা ঘুষি। বললাম, কী গান ভালো লাগেনি? বললো, অনেক দারুণ। ‘তুমি কি কহিলা গানে আগুন দিলা প্রাণে, যখন তখন পোড়ায় এমন যখন কাছে টানে।’ সবগুলো গান কলকাতায় রেকর্ডিং করা হয়েছিল। গানগুলোর সুর-সঙ্গীত করেছিলেন আলাউদ্দিন আলী ভাই। জাফর ইকবালের সাথে আমার বন্ধুত্ব অনেক ভালো ছিল। শাহনাজ রহমতউল্লাহ আমাকে দেখলে বলেন, ‘তোমাকে দেখলে আমার জাফরের কথা মনে পড়ে।’ আমি তাকে মা ডাকি। অনেক বেশি চঞ্চল ছিল। মিউজিকের প্রতি ওর ভীষণ ভালোলাগা ছিল। অনেক ভালো গান গাইতো। অনেক র্স্মাট ছিল। শুধু কাপড়-চোপড়ে নয়, ওর রুচিবোধ ইন্টেলেকচুয়্যাল হাইট, ফ্যাশন সচেতন টো টু হেড মেইন্টেইন করা একটা ব্যাপার ছিল, যা তখন শোবিজের আর কারও দেখিনি। আমি নিজেই দেখেছি তিনশ’ রকমের জুতো। আলাদা একটা শু-কর্ণার ছিল। জুতোর সাথে ড্রেসের একটা মিল থাকতো। এখনকার কোনো নায়কের এমন আছে কি-না জানি না। সেই সময় এইগুলো মেইন্টেইন করতো। জাফর ইকবাল শাহনাজ রহমতউল্লাহর বড় সেটা কিছুদিন আগে জেনেছি। মিউজিকের বাইরে একমাত্র তার সাথে আমার ভালো সখ্য ছিল। জাফর ইকবাল ছাড়া কারও বাসায় রাত কাটাইনি। এমনও হয়েছে ওর স্ত্রী বাইরে শুয়েছে, আমি আর জাফর ইকবাল একসাথে থেকেছি। শুধু বন্ধু ছিল না, ভাই ছিল আমার। জীবনের এমন অনেক ঘটনা ঘটে যায়।
আমাদের সময় তো অডিও অ্যালবামের রমরমা অবস্থা। তখন আমার প্রথম অ্যালবাম হিট। পুরো অ্যালবামের সব গানই হিট। তখন শোয়ের জন্য আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, আর আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কারণ আমার শুরু হয়েছে ব্যান্ড দিয়ে। আমি ভীষণরকম পারফেকশনিস্ট ছিলাম। এখনও আছি, আগামীতেও থাকবো আশা রাখি। এমন শো করি না এমনি একটা পিচ বাজিয়ে দিলো অথবা রেডিমেট কিছু একটা হলে গান করবো। স্টেজে উঠে টাকা নিয়ে চলে এলাম এমন কখনও ছিলাম না । অনেকে বলে শুনি, স্টেজে উঠলেই তো টাকা। এটা আমার মধ্যে কখনও ছিল না, এখনও নেই। কেননা আমার প্রতিটা শোতে আমি কিছু না কিছু নতুনত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি, করি। আমি ব্যান্ড করতে পারিনি বলে ওই পিকে থাকা অবস্থায় ছয়-সাত মাস আমি কোনো শো করিনি। তখন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, হাবলু, পিয়ারু খান, শেখ ইশতিয়াকদের মতো গুণী মানুষরা আমার সাথে বাজাতো। নকীব খান ভাই আমার সাথে বাজিয়েছেন। প্রথম বিদেশ যাত্রা আমার সাথেই। আমার সাথে আইয়ূব বাচ্চু, পার্থ বড়ুয়া বাজিয়েছে মিউজিশিয়ান হিসেবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে আইয়ূব বাচ্চু আমার সাথে শেষ বাজিয়েছে। পান্থ কানাই আমার সাথে বাজিয়েছে। শওকত আলী ইমন আমার সাথে বাজিয়েছে। হ্যাপী এবং লাকী আখন্দ ভাইকে পেয়েছি আমার তিন-চারটা শোতে। এটা আমার জন্য বিরাট একটা অর্জন। কারণ এসব গুণী মানুষ আমার সাথে বাজিয়েছেন। মিউজিকের হস্তি সমান মানুষগুলোর সাথে থেকে অনেককিছু জেনেছি। আরও বেশি পারফেকশনিস্ট হতে পেরেছি তাদের সাথে থেকে। আমার চেয়ে তাদের ডেডিকেশন দেখেছি স্টেজে। শেখ ইশতিয়াকের অনেক ডেডিকেশন দেখেছি । বলেছে ঠিকমতো না হলে কিন্তু বাজাবো না। গর্ব হয় এমন মানুষদের সাথে আমি কাজ করেছি।
প্রতিটি শিল্পীর জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট থাকে। আমার জীবনের টার্ন করে দেয় ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটা। এটা সম্ভবত ১৯৮২ সালের দিকের গান। গানটা লিখেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, সুর করেছিলেন নকীব খান। তোরে পতুলের মতো করে সাজিয়ে গানটা আমার টার্নিং পয়েন্ট হলেও ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটা আমাকে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে। গানটা লিখেছেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী, সুর করেছেন লাকী আখন্দ। গানটা আমাকে সঙ্গীতে দীর্ঘস্থায়ী করেছে, একটা ভালো জায়গা করে দিয়েছে। দর্শকদের মনে দারুণভাবে বসে গেছি গানটার জন্য।
