গত ২২ জুন আমার মেয়েদের নিয়ে লন্ডনে ঘুরতে যাই। ১৮ দিনের সফর। লন্ডনে আমার খালার বাসা ইলফোর্ডে ছিলাম। দারুণ কেটেছে সময়গুলো। এবার আমি কোনো কাজে যাইনি। শুধু ঘুরতে গিয়েছিলাম। আমার মেয়েরা এর আগেও লন্ডনে গিয়েছিল কিন্তু তখন ছোট ছিল। তেমন কিছুই ওদের মনে নেই। তাই এবার তাদেরকে লন্ডনের সব বিখ্যাত জায়গাগুলোয় নিয়ে যাই। অনেকদিন কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। তাই এবার প্রায় সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ রেখে শুধু ঘুরে বেরিয়েছি। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার বন্ধ রেখেছিলাম। অনেকদিন ধরে পিকনিক মিস করছিলাম। আমাদের দেশে এখন পিকনিক প্রথাটা হয়তো দিন দিন নাই হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এত ব্যস্ত যে সেই সুযোগটা হয় না, তাই লন্ডনে যে ক’দিন খালার বাসায় ছিলাম সেখানে দুপুরে সবাই পিকনিকের মতো লাঞ্চ করতাম। খালার বাসার পেছনে বিশাল বড় মাঠের মতো জায়গা। সেখানে চাদর বিছিয়ে প্রতিদিন দুপুরে একসাথে বসে খাবার খেয়েছি। এবার লন্ডনে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে লন্ডন আই গিয়ে। এটি নাগরদোলার মতো। সেখান থেকে পুরো লন্ডন শহর দেখা যায়। ৩০ মিনিটের মতো সময় এটা ঘুরতে থাকে। দারুণ লাগে শহরটা। শহরের দিনের সৌন্দর্য ও রাতের সৌন্দর্য সম্পূর্ণ আলাদা। লন্ডনে সূর্য ডোবে রাত ১১টায়। আমরা ৯টায় লন্ডন আইতে উঠি। প্রায় একঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। এখন লন্ডনে প্রচুর গরম। সাথে আমার খালা-খালু গিয়েছিল। খুব কষ্ট হয়েছিল লাইনে দাঁড়াতে। লন্ডনে মূলত সারাবছর টুপটাপ বৃষ্টি হতেই থাকে। তাই বিরক্তিতে অনেকেই ঘুরতে বের হয় না। কিন্তু এখন গরমের সময় হওয়ায় সবাই ঘুরতে বের হয়। তাজমহল ও পিরামিডের চেয়ে এখন লন্ডন আইতে পর্যটক সংখ্যা অনেক বেশি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে সবার একাত্বতা। এখানে আমরা কে, কোন দেশ থেকে গিয়েছি সেটা মূল বিষয় নয়, সবাই সবাইকে সাহায্য করছি। একসাথে আনন্দ করছি।
এরপর একদিন মাদাম তুসো গেলাম। সেখানে সব মোমের মূর্তি। বিশ্বের সব বিখ্যাত মানুষদের মোমের মূর্তি সেখানে রয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের সব বিখ্যাত মানুষদের সাথে ছবি তুলেছি। মাইকেল জ্যাকসন, ডায়না, এলভিস থেকে শুরু করে বলিউড তারকাদেরও মূর্তি দেখলাম এবার। মূর্তিগুলো দেখলে মনেই হবে না এটা মূর্তি, এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি করা। মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত সঠিক মাপ নিয়ে মূর্তিটি তৈরি করা হয়। আর এই মাপ নিতে সময় লাগে প্রায় ৮ ঘণ্টা। কারণ প্রতিটি নখ, চুলের সঠিক মাপ নেয়া হয়। এতটাই নিখুঁত যে কেউ প্রথম দেখলে চমকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক না। মেয়েদের নিয়ে পুরো সময়টা আমি সেলফি তোলায় মেতে ছিলাম।
লন্ডনের ট্রাফালগড় স্কয়ারেও গিয়েছিলাম। যেখানে সিংহের মূর্তি, ঝরনা এবং সামনে বার্কিংহাম প্যালেস। যেখানে রাণী এলিজাবেথ থাকেন। রাণী প্যালেসে আছেন কি-না, এটার বোঝার ব্যবস্থাও আছে। একটা চিহ্ন আছে যেটা দেখলে বোঝা যায়। আমরা যখন যাই তখন রাণী এলিজাবেথ সেখানে ছিলেন। দারুণ মুহূর্ত ছিল সেই সময়টা। যদিও তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবুও এমন বিশ্ব বিখ্যাত মানুষ যেখানে আছে তার কাছাকাছি আমরা বিষয়টি ভাবতেই ভালো লাগে। সেখানে ব্রিটিশদের ঐতিহ্যবাহী রয়েল গার্ডরা এখনও ঘোড়ায় চড়ে।
আরেকদিন দেখলাম ব্রডওয়ে শো লায়ন কিং। যার বর্ণনা দেয়া সম্ভব না। চোখের সামনে লাইভ গান, অভিনয় আর মঞ্চের লাইট পরিবর্তন কারিশমা অবিশ্বাস্য। আর দর্শকদের হাততালি। দীর্ঘ ৫ মিনিট তালি এই প্রথম শুনলাম।
আরও অনেক জায়গায় ঘুরেছি। এ ভ্রমণটা আমার কাছে স্মরণীয়, কারণ এর আগে এত বড় ভ্রমণ ওদের নিয়ে করা হয়নি। লন্ডনে নতুন একটি শপিং মল হয়েছে। সেখানে আমরা সারাদিন শপিং করি। ৯ জুলাই আমরা ঢাকায় ফিরি। খারাপ লেগেছে। মনে হয়েছে পুরোটা জীবন যদি এভাবে কেটে যেত তাহলেই মনে হয় ভালো হতো।
