ঢাকা ছাড়ছে মানুষ চোখে মুখে উচ্ছ্বাস

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৫, ২৩:৪৭

ঈদে ফিরতে হবে বাড়ি। মিলিত হতে হবে প্রিয়জনদের সঙ্গে। রেলস্টেশন, বাস স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চঘাটে মানুষের চাপ বাড়ছে। গতকাল শবে কদরের ছুটি ছিল। ঈদ উল ফিতরের ছুটি শুরু হবার আগে আজ একদিন কর্মদিবস। ফলে সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই এক দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন। 

 
গতকাল কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেড়েছে ৩০টি ট্রেন। তবে গত বছরের মতো এবছর সিডিউল নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হয়নি। সকালে ঢাকার বাস স্ট্যান্ডগুলোতে ভিড়ের দুর্ভোগ পোহাতে না হলেও বৃষ্টির কারণে ঠিকই নাকাল হতে হয়েছে ঘরমুখো যাত্রীদের। এর মধ্যে রাজধানী থেকে উত্তর ও দক্ষিণের পথে দুই মহাসড়কে যানজট ও জলজটের কারণে তাদের গাড়িতে বসে থাকতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়। তারপরও ঘরেফেরা নারী-পুরুষ, শিশুদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে পানি জমে যাওয়ায় কিছুটা যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
 
অপর দিকে সদরঘাট লঞ্চঘাটে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ছেড়ে গেছে ১১০টি লঞ্চ। এছাড়া দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়ার অন্যতম নৌপথ শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দিতে মানুষের বাড়তি চাপ ছিল। সকাল ছয়টা থেকে মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। বাসটার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চ ঘাটে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে সাধারণ মানুষকে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয়নি। মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
 
গতবছর কোরবানি ঈদের আগে চাঁদাবাজি বন্ধ ও যানজট নিরসনে মহাসড়কের ১৫টি। ওয়াচ টাওয়ার নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে বসানো হয়েছিল আইপি ক্যামেরা (ইন্টারনেট প্রটোকল ক্যামেরা)।  আর রাজধানীর প্রবেশমুখে ১২টি পয়েন্টে বসানো হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু সেগুলোর এখন আর কোন কার্যকারিতা নেই। 
 
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষ স্বস্তিতেই ফিরতে পারবে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ড পরিদর্শনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এবার ঘরে ফেরা মানুষের কোনো ভোগান্তি হবে না। আশা করি স্বস্তিতেই সবাই বাড়ি ফিরতে পারবে। সড়ক-মহাসড়কে কোনো অস্বস্তিকর পরিবেশের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাস্তার অবস্থাও ভালো।
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন, ঘরমুখে মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে পারে সেজন্য হাইওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশ, জেলা পুলিশসহ  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
 
চাঁদাবাজি বন্ধে ওয়াচ টাওয়ার 
 
মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ ও যানজট নিরসনে ১৫টি পয়েন্টে বসানো হয় ওয়াচ টাওয়ার। প্রতিটি টাওয়ারে স্থাপন করা হয় তিনটি আইপি ক্যামেরা। অপরদিকে গতবছর কোরবানির হাটে চাঁদাবাজি বন্ধে রাজধানীর প্রবেশ মুখের ১২টি পয়েন্টে বসানো হয়েছিল ১২টি সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরা। ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়-আশুলিয়ার বাইপাইল, নবীনগর, আমিন বাজার, নারায়ণগঞ্জের তিন পয়েন্ট, কাঁচপুর, ঢাকা-সিলেট সড়কের গোলাকান্দাইলে। সর্বশেষ গত রবিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দিতে উদ্বোধন করা হয় ওয়াচ টাওয়ার। অভিযোগ রয়েছে, এসব ওয়াচ টাওয়ারের কোন কার্যকারিতা নেই।
 
তবে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ওয়াচ টাওয়ারের মধ্যে দুই একটি বাদে সবগুলোরই কার্যক্রম চলছে। এখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দিনের বেলায় বাইনোকুলার ব্যবহার করেন। আর রাতে ব্যবহার করেন নাইট ভিশন। পাশাপাশি ক্যামেরার সাহায্যে মহাসড়কের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে রাজধানীর ১২টি পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, এগুলোর অধিকাংশই এখন আর সচল নেই।
 
কমলাপুর রেলস্টেশন
 
কমলাপুর রেলস্টেশনে গতকাল সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের মোটামুটি ভিড় বাড়তে থাকে। রেলস্টেশনে ছিল মোটামুটি স্বস্থির পরিবেশ। হালকা ভিড় এড়িয়ে পরিবার-পরিজন, লাগেজ নিয়ে ?মানুষ উঠছেন ট্রেনে। আর সঠিক সময়ে ট্রেনের যাত্রা শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে তেমন ভোগান্তিও নেই। তবে বৃষ্টির কারণে রেলস্টেশনে পৌঁছাতে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তারপরও ঘরে ফেরা নারী-পুরুষ, শিশুদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। 
 
রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান বলেন, প্রতিবছর যে ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় তেমন কোন অভিযোগ গতকালও পাওয়া যায়নি। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে গেছে ৩৫টি ট্রেন। যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম ঠেকাতে মোতায়েন করা হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য।
 
মহাসড়ক
 
রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে ঈদযাত্রার শুরুতেই বিপত্তিতে পড়েছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাসন, সাইনবোর্ড, মালেকের বাড়ি, বড়বাড়ি, চান্দনা-চৌরাস্তা মোড়ের পশ্চিম অংশ এবং ভোগড়া বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটু পানি জমে থাকতে দেখা যায়। দুপুরের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানি জমে থাকায় চালকরা ধীর গতিতে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়েছেন। এদিকে মেঘনা সেতু এলাকায় সড়ক মেরামত এবং গোমতী সেতুতে ট্রাক বিকল হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে রাত থেকে বিচ্ছিন্নভাবে যানজট ছিল। রাস্তা মেরামত ও দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও ধীর গতিতে চলে যানবাহন।
 
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির কারণে গাজীপুর ও ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের কিছু জায়গায় পানি জমে যাওয়ার কারণে যানবাহন চলাচলে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। তবে এ সমস্যা বেশিসময় স্থায়ী হয়নি। তিনি আরো বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে (বঙ্গবন্ধু সেতু) প্রতি বছরই যানজটে ঘরমুখে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ কারণে এ বছর ৩০টি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। পাশাপাশি থাকছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। আশা করা হয়, এ বছর খুব একটা সমস্যা হবে না।
 
সদরঘাট
 
নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সচিব খোকন মিয়া বলেন, গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চঘাটে যাত্রীদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১১০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। তবে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিষয়টি ব্যাপকভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রীদের টার্মিনালে আসতে ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে।
 
দুই ফেরিপথে ট্রাক পারাপার বন্ধ 
 
দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে বন্ধ রাখা হয়েছে পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার। দুই নৌপথেই বর্তমানে ১৮টি করে ফেরি চলছে। দুটি বহরে আরো একটি করে ফেরি যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা। ঈদের যাত্রী পারাপারের জন্য পাটুরিয়া ঘাটে ৩৭টি এবং মাওয়া ঘাটে দুইশ লঞ্চ চলাচল করে। বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, ঈদে যাত্রীবাহী লঞ্চের ছাদে ‘লোড লেভেল’ বা বিপদসীমা ছাড়িয়ে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানো এবং অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা যাবে না।
 
তিনি বলেন, খারাপ আবহাওয়ায় কোনও লঞ্চ চলাচল করবে না। সারাদেশে ফিট সার্টিফিকেটধারী ৫৯০টি লঞ্চ চলাচল করবে। আর ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অভিমুখে প্রতিদিন ৬০টি লঞ্চ ছেড়ে যাবে। ঈদের আগে ৫ দিন ও পরে ৫ দিন দেশের প্রতিটি নৌঘাটে বিশেষ পরিদর্শক টিম মোতায়েন থাকবে।
 
তিনি আরও বলেন, ঈদের সময় নদীর মাঝপথ থেকে নৌকা দিয়ে যাত্রী উঠানো যাবে না। এ বিষয়ে কোস্টগার্ড দেখাশুনা করবে। লঞ্চে পর্যাপ্ত বয়া থাকতে হবে।
 
৬ দিন ট্রাক লরি কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ
 
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, ঘরমুখো ও ঢাকা ফেরত মানুষের সুবিধার জন্য মহাসড়কে ঈদের আগের তিন দিন ও পরের তিন দিন  সকল প্রকার ট্রাক-লরি, চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাপণ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও পোশাক শিল্পের পণ্য বহণকারী ট্রাক বা লরি চলাচল করতে পারবে।
 
আজ থেকে ট্রেনের ফেরতযাত্রার আগাম টিকেট
 
ঈদ উদযাপন শেষে যাত্রীদের ফেরার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ বৃহস্পতিবার থেকে অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরু করবে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঈদ-পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরু হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন থেকে ফেরত যাত্রার অগ্রিম টিকেট বিক্রি হবে। ২০ জুলাই যাত্রার টিকেট ১৬ জুলাই, ২১ জুলাই যাত্রার টিকেট ১৭ জুলাই, ২২ ও ২৩ জুলাই যাত্রার টিকেট ১৯ জুলাই এবং ২৪ জুলাই যাত্রার টিকেট ২০ জুলাই বিক্রি করা হবে।
 
বাড়ছে দুর্ঘটনা
 
মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০ জনের অধিক লোক মারা গেছে। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছে। বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অপর দিকে গতকাল সাতটা থেকে  বেলা ১১টার মধ্যে রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ খড়খড়ি ও জেলার মোহনপুরের কেশরহাট পৌর এলাকা ও পুঠিয়ার বানেশ্বর পৌর এলকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৬ জন।