ঈদের ছুটি। বাড়ি ফিরছে মানুষ। কাঁধে ব্যাগ, সাথে পরিবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে, টার্মিনালে আটকে থেকে বাড়ির পানে ছোটা। ক্লান্তি নেই তাতে এতটুকু! কিসের টানে ঈদে এত কষ্ট করে বাড়ি ফেরে মানুষ? এত যানজট ঠেলে, বেশি ভাড়া গুণে, পথের কষ্টকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজের জন্মভিটায় মা-বাবা বা আত্মীয়ের সান্নিধ্য পাবার এই টান কেন?
মানুষ কেন সুযোগ পেলে, ছুটি পেলে, মন খারাপ হলে বা আনন্দের জানান দিতে বাড়ির পানে ছোটে? এই বাড়ি কোন শহরের দমবন্ধ করা চার দেয়ালের ঘর নয়। এ হলো পূর্বপুরুষের ভিটা বা জন্মস্থান। নাড়ির টান কিংবা মাটির টান বিষয়টা কী? কেন আমরা এই অমোঘ টানের নিয়ন্ত্রণে? মানুষ তার স্নায়ুতন্ত্রে কেন এই তীব্র টান অনুভব করে?
মনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, এই টান মানুষের মজ্জাগত। মানুষের জেনেটিক কোডে এটি সংরক্ষিত রয়েছে। আবার বুদ্ধিজীবীদের অভিমত, কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে মাটির প্রতি, শেকড়ের প্রতি টান থাকবে– এটাই স্বাভাবিক। শহরকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এই টান দেখা যায় না। তারা এ ধরনের বড় ছুটিতে দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যায়।
কবির ভাষায়: ‘আজ আর আমার শহরের এই অন্ধ ফুটপাতের কাছে,/এই সব মুখোশ-পরা মুখের কাছে কিছুই চাওয়ার নেই;/ দাঁত আর নখের গর্বে যারা মত্ত তারা কেন/ আমার জন্য কখনো চোখের জল ফেলতে যাবে?/ তোমরা যারা ডোবা-বিল খেতখামারের লকলকে ঘাসের মধ্যে ডুবে আছ,/ তোমরা যারা গায়ে মাখ পাকা ধানের গন্ধ,/ তাদের বলি, আমার জন্য রেখে দিয়ো একফোঁটা অশ্রু। (রেখে দিয়ো, মহাদেব সাহা)
যেখানে একজন মানুষের জন্ম-শৈশব কেটেছে, পরিবার, পূর্ব পুরুষের ধারাবাহিক বসবাস রয়েছে- তার একটা আকর্ষণ রয়েছে মানুষের কাছে। একটি বাড়ি, কয়েকজন মানুষ, সেই মানুষগুলোকে ঘিরে তার অস্তিত্ব, যে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের দিকে তাকিয়ে তার শৈশবের কল্পনা বিস্তার ঘটেছিল, যেখানে তরুণ বয়সের স্বপ্নগুলো পাখা মেলেছিল, যে গ্রাম, শহরে বা পাড়ায় একজন মানুষের সেই স্বপ্নগুলোকে সত্যি করে তুলবার শক্তি যুগিয়েছে–সেখানে ফিরতে মন টানে। সেখানে ফিরে গেলে যেন ফেলে আসা সেই শৈশব, স্মৃতিময় দিনগুলোতে ফিরে যাবার একটা অনুভূতি ফিরে আসে।
প্রয়োজনের তাগিদে, চাকরি বা ব্যবসার কারণে একজন মানুষ যেখানে থাকে সেখানে হয়তো সে একজন নগণ্য ব্যক্তি কিন্তু নিজের গণ্ডিতে সেই ব্যক্তিই হয়ে ওঠেন বিশেষ একজন। সেখানে তার আশ্রয়। সে আশ্রয় মনের, আত্মিক আশ্রয়। রয়েছে অকপটভাবে নিজেকে প্রকাশের সাবলীল পরিবেশ। অসহায় মুহূর্তে বাড়িই যেন আমাদের কাছে শেষ আশ্রয়স্থল।
কংক্রিটের এই শহরে যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষ ভেতরে ভেতরে অসহায়বোধ করতে থাকে। বাস্তবতা মেনে ক্ষণিকের জন্য হলেও সে মুক্তি চায়। সে বুঝতে পারে এই যন্ত্রের মত উদয়াস্ত ছুটে চলা, চারপাশে তারই মত আরো কিছু যান্ত্রিক মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনভাবেই আত্মিক নয়। এদের কাছ থেকে মানুষ কিছু প্রত্যাশাও করে না। সে মনের গহীন গোপনে ফিরে পেতে চায় তার আত্মার আত্মীয়ের সান্নিধ্য।
জন্মের জায়গা, জন্মস্থানের সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ রয়েছে। রয়েছে আত্মার স্পর্শ। বাড়ি মানেই তো শৈশব, কৈশোর, গাছপালা, সবুজ মাঠ, বাবা-মা, ভাই-বোন, নদী, পুকুর—এসব জড়িয়েই তো বাড়ি। বাড়ি ফেরা মানে, মানুষের তার আপন লোকদের মাঝে ফিরে যাওয়া। যাদের সঙ্গে ভদ্রতা, কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতার পরিচয় নয়– তাদের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক। সেই সান্নিধ্যের মধ্যে, হূদয়ের উষ্ণতার মধ্যে ফিরে যাওয়া। যাদের সুখ-দুঃখের কথা অকপটে বলা যায়। যাদের সঙ্গে বুদ্ধির সম্পর্ক নয় আবেগের সম্পর্ক। বাড়ি ফেরা মানে মাটির কাছে যাওয়া। এমন জায়গায় যেতে কার না মন চায়। সেই মানুষের কাছে, সেই পরিবেশে ফিরে যেতে মানুষের আকুতি চিরকালীন।
ঈদ এলেই মানুষের বাড়ির টানের তীব্রতা চোখে ধরা পড়ে বেশি। সীমাহীন যানজট উজিয়ে, বেশি ভাড়া গুনে পথের নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে তারা ফিরতে চায় তার ফেলে আসা স্মৃতিগন্ধমাখা বাড়িতে। মনের কোণে বারবার হাতছানি দেয় সেই মেঠো পথ, জমির আল ধরে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়া, সবুজ গাছের সারি, নদীর পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি আর দল বেঁধে মাছ ধরার স্মৃতিময় দিনগুলো। বিজলী বাতিহীন গ্রামের পথে রাতের তারার আলোয় পথচলা, দূর গ্রাম থেকে দল বেঁধে যাত্রা দেখে ফেরার দিনগুলো বিদ্যুত্ চমকের মত হিল্লোল তোলে শরীরে, মনে।
কংক্রিটের এই শহরে যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষ ভেতরে ভেতরে অসহায়বোধ করতে থাকে। বাস্তবতা মেনে ক্ষণিকের জন্য হলেও সে মুক্তি চায়। সে বুঝতে পারে এই যন্ত্রের মত উদয়াস্ত ছুটে চলা, চারপাশে তারই মত আরো কিছু যান্ত্রিক মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনভাবেই আত্মিক নয়। এদের কাছ থেকে মানুষ কিছু প্রত্যাশাও করে না। সে মনের গহিন গোপনে ফিরে পেতে চায় তার আত্মার আত্মীয়ের সান্নিধ্য।
শহরে বা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনের তাগিদে বাস করে মানুষ। সেখানে হয়তো তিনি নগণ্য ব্যক্তি কিন্তু নিজের গণ্ডিতে সেই ব্যক্তিই বিশেষ একজন। যেখানে রয়েছে অকপটভাবে নিজেকে প্রকাশের সাবলীল পরিবেশ। অসহায় মুহূর্তে সেই বাড়িই যেন প্রত্যেকের কাছে শেষ আশ্রয়স্থল।
এ প্রসঙ্গে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক সমাজ। কৃষি সভ্যতার কারণে এখানকার মানুষের মাঝে এই মাটির টান। উন্নত দেশে যারা নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে তাদের মাঝে এই টান দেখা যায় না। ছুটিতে তারা পরিবারের সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যায় কোন পর্যটন কেন্দ্রে। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের সাংস্কৃতিক গতিধারা তৈরি হয় মাটিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে তাই জন্মভিটায় ফেরার এই তীব্র টান দেখা যায়। তিনি আরো বলেন, এমনকি যারা ছোটবেলা থেকে নগরে বেড়ে উঠেছে, পূর্বপুরুষের বসতভিটার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক কেবল বছরে একবার বা দুবার বেড়াতে যাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ তারাও শেকড় হিসাবে সেই গ্রামকেই বোঝে। যতদিন না তার নতুন কোথাও শেকড়ের পত্তন ঘটছে।
কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বললেন, মানুষের নাড়ির ভেতরের এই টান জমা থাকে। মা-বাবা, প্রিয়জন ও জন্মভিটার প্রতি এই টান মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা তার মোটিভেশনাল ফোর্স গাইডেড বাই জেনেটিক কোড। তিনি বলেন, মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে। মা-বাবার বংশগতির ধারা সন্তান বহন করে। তাই মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মানুষের টান সহজাত। সে কারণেই উত্সবে, আনন্দে বা কষ্টের মুহূর্তে মানুষ প্রিয়তম মানুষের প্রতি টান অনুভব করে। সে কারণেই ঈদের ছুটিতে বাড়িতে বাড়িতে ফেরার এই টান চোখে পড়ে। তার মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। সেই উদ্দীপনাই তাকে তাড়িত করে।
কবি মহাদেব সাহা বলেন, জন্মের জায়গা, জন্মস্থান প্রতিটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ রয়েছে। আত্মার স্পর্শ আছে। এটা একজন মানুষ আজীবন বহন করে বেড়ায়। বাড়ি মানেই তো শৈশব, কৈশোর, গাছপালা, সবুজ মাঠ, বাবা-মা, ভাই-বোন, নদী, পুকুর–এসব জড়িয়েই তো বাড়ি। বাড়ি ফেরা মানে, মানুষের তার আপন লোকদের মাঝে ফিরে যাওয়া। যাদের সঙ্গে ভদ্রতা, কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতার পরিচয় নয়–তাদের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক। সেই সান্নিধ্যের মধ্যে, মানুষের উষ্ণতার মধ্যে ফিরে যাওয়া। যে মানুষদের সুখ-দুঃখের কথা অকপটে বলা যায়। যাদের সঙ্গে একটি মানুষের বুদ্ধির সম্পর্ক নয় আবেগের সম্পর্ক। বাড়ি ফেরা মানে মাটির কাছে যাওয়া। এমন জায়গায় যেতে কার না মন চায়। সেই মানুষের কাছে, সেই পরিবেশে ফিরে যেতে মানুষের আকুতি চিরকালীন। ‘ভাইয়ের মায়ের এমন স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ’– সে তো এই বাড়িতেই!
ঈদ এলেই মানুষের বাড়ি ফেরার এই তীব্র আকৃতি চোখে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসস্ট্যান্ডে বা লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে থেকে, নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে মাত্র দুই বা তিনদিনের জন্য বাড়ির পানে ছোটে মানুষ। কেন? প্রশ্ন করেছিলাম দিনাজপুরের বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদনান শরীফকে। তিনি বললেন, গ্রামে কয়েকদিন কাটিয়ে এলে মনে হয় মোবাইলের মত নিজেকে রিচার্জ করিয়ে এলাম। মনটা অনেক হালকা হয়। ঢাকায় প্রতিদিন চাকরি, সংসার, বাজার সামলিয়ে আয়ের পেছনে ছুটে চলার পর মন দমে যায়। তখন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার চাইতে গ্রামে গেলেই বেশি ভাল লাগে। অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, নিজের শৈশব, কৈশোরের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটালে খুব আনন্দ পাই। মনে হয়, যেন বয়সটা কমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলরুবা আফরোজ বলেন, বাঙালিরা চারিত্রিক দিক থেকে খুব আবেগপ্রবণ হয়। সে কারণে যেখানে হূদয়ের টান অনুভব করে সেই কাজটি করবার জন্য মনের তীব্রতা বেড়ে যায় তার। এই শেকড়ের টান হচ্ছে নিখাদ আবেগীয় টান। তিনি বলেন, তারাই বাড়ি যেতে চায় যাদের স্বজনরা এখনো বাড়িতে রয়েছেন। যাদের ভালোবাসার টান খুব তীব্র। যেখানে একটি মানুষ ছোটবেলায় মানুষ হয়েছে, বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, রয়েছে তার স্মৃতি ঘেরা স্থান। তারাই শহর থেকে গ্রামে ফিরে যায়– ফিরে যায় তার শৈশবে।
ড. দিলরুবা আফরোজ বলেন, এমনকি যারা ছোটবেলা থেকে নগরে বেড়ে ওঠে। তার পূর্বপুরুষের বসতভিটার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক কেবল বছরে একবার বা দুবার বেড়াতে যাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ তারাও শেকড় হিসাবে তার সেই গ্রামকেই বোঝে। যতদিন না তার নতুন কোথাও শেকড়ের পত্তন ঘটছে। কারণ যেখানে সে কাজের প্রয়োজনে বাস করছে সেটা সেই মানুষটির নিজের বা তার পূর্বপুরুষের জন্মস্থান বা বংশপরম্পরায় বেড়ে ওঠার স্থান নয় বলে সেই জায়গার প্রতি তার টান জন্মায় না। তার হূদয়ে দাগ কেটে থাকে সেই স্থান যেখানে তার স্বজনদের স্মৃতির দাগ লেগে রয়েছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের টিকেটের জন্য সারারাত অপেক্ষায় ছিলেন ব্যবসায়ী স. ম. জাকারিয়া। তার বাড়ি ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে। তিনি বললেন, তিরিশ বছর ধরে ঢাকায় আছি। কিন্তু প্রতিবছর ঈদের সময় বাড়ি যাই। এখন যা আয় করি এতে ভালোভাবে পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারি। বাড়িতে থাকলে এটা পারতাম না। কিন্তু তারপরও সবসময় মনে হয়, ইশ, যদি বাড়িতেই থাকতে পারতাম। কিন্তু তা তো আর হয় না। সে কারণে বছরে একবার হলেও ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়িতে যাই। ভালো লাগে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঈদ করতে ঢাকায় এসেছেন ফাহিম মুতনাতির। রোজার শুরুতেই ঢাকা ফিরে এসেছেন তিনি। ঈদ করে আবার ফিরে যাবেন বোস্টনে। বাড়ির টান কেমন অনুভব করেন। উত্তরে ফাহিম বলেন, পরিবারের মানুষদের ছেড়ে আমেরিকাতে থাকতেও ভালো লাগে না। পড়াশোনা, কাজের ফাঁকে সবসময় বাড়ির জন্য মন কাঁদে। বাড়িতে থাকার সময় হিসাব করে চলতে হয় না। সবাই আমাকে বোঝে। এটার যে কী শান্তি তা বলে বোঝানো যাবে না। বাইরে থাকার সময় তো সবসময় ‘অ্যাডজাস্ট’ করে চলতে হয়। নিজের বাড়িতে সেই বাধ্যবাধকতা থাকে না।