প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সরকারি কর্মকর্তাদের আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দেশের অধিকতর অগ্রগতির স্বার্থে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কালক্ষেপণ সহ্য করা হবে না। উন্নয়ন যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের আর্থিক নীতি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ের সরকারি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধা-অসুবিধা উভয়ই মোকাবেলা করতে হয়। তবে আপনাদের প্রথম দেশের কথা বিশেষ করে দরিদ্র ও শ্রমিক শ্রেণির বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কিভাবে টিকে থাকবো এটা বড় বিষয় নয়। আমাদের কম সুবিধাভোগী এবং দরিদ্র ও অতি দরিদ্রদের নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই হবে আমাদের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কি পেলাম বা পেলাম না, এটা বড় করে দেখলে চলবে না। আমাদের নিচের দিকে তাকিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের প্রধান বিবেচনা হবে যে, দেশ ও জনগণের জন্য আমরা কতটা সেবা দিতে পারলাম। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা গড়া এবং জনগণের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে কর্মকর্তাদের আরো উদ্যোগী হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ও দেশের উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুফল সবার মাঝে পৌঁছে দিতে কাজ করে। তিনি বলেন, সকল সামাজিক খাতে ব্যাপক সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি দৃঢ় বিশ্বাসী যে, আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো। এ প্রসঙ্গে তিনি বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই মেগা প্রকল্প আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, এটি নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করবো। আমরা আমাদের এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যেমন পদ্মা সেতুর মতো একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি, সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝেও এ ধরনের আস্থা থাকতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যারা আছেন, তাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা বিনিয়োগ বোর্ড ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে একীভূত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ দুটোকে আমরা এক করে দেব। ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে মোটামুটি পেপার আমাদের তৈরি। শুধু কার্যকর করাটা এখনো হয়নি। এটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল শিগগিরই বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যেই পেপার তৈরি হয়েছে। শুধু কার্যকর করা বাকি। তবে সেটি কার্যকর করা উচিত বলে আমি মনে করি। এ মাসে তা বাস্তবায়নের কথা। ইনশাল্লাহ করে দেব। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময় দেশে আয় বৈষম্য কমেছে। সরকারের এই মেয়াদে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার অঙ্গীকারের কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য নাগরিক সুবিধা সম্বলিত বাড়িঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রামের মানুষের জন্য নাগরিক সুবিধা সম্বলিত ‘পল্লী জনপদ’ নামে একটি প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য গ্রামের মানুষও যেন নাগরিক সুবিধা নিয়ে বসবাস করতে পারে সেই ব্যবস্থাটা করে দেয়া। গ্রাম ও শহরের মানুষের বৈষম্য দূর করা। শেখ হাসিনা তার সরকারের সময় ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালে সরকার গঠন করার পর নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করছে। তার কিছু কিছু ফলাফল দেশবাসীকে ইতোমধ্যেই সরকার দিতে পেরেছে। দারিদ্র্যের হার কমানো, ছয় বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ছয় শতাংশের ওপর ধরে রাখা, রিজার্ভ বৃদ্ধি, বাজেট চারগুণ বৃদ্ধি, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো, গড় আয়ু বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো এবং তথ্য-প্রযুক্তিতে অগ্রগতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একেবারে নিম্নবিত্ত মানুষদের ধীরে ধীরে উপরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। ফলে সকলের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর প্রধান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও অধীন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তাদের কাজের ওপর উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়।