ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদ-নদীসমূহের পানি ১৩টি সংযোগ খালের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হলে নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, এ বিষয়ে ভারতকে চিঠি (নোট ভার্বাল) দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গায় পানি প্রত্যাহার করে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। তাই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকতে ভারতকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি, ভারতের পত্র-পত্রিকায় নদী সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভারতকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, আন্তঃদেশীয় নদীসমূহে তারা এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেবে না। এমনকি গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরে এসেও স্পষ্ট করে বলেছেন যে ভারত অভিন্ন নদীসমূহে এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেবে না। বাংলাদেশকে যুক্ত রেখেই তারা সব সিদ্ধান্ত নেবে।
এ প্রসঙ্গে যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন ইত্তেফাককে জানান, ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি স্থানান্তর করে গঙ্গা অববাহিকায় দেয়া হলে সেটি যে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে তা জেআরসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে ভারতকে জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয় এমন কিছু কখনোই করা হবে না বলে ভারতের পক্ষ থেকেও বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভারত সরকার যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি তুলে ধরে ভারতকে নোট ভার্বাল পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে।
ভারতজুড়ে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের অংশ হিসাবে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের ‘তিস্তা-গঙ্গা-মানস-সংকোষ’ নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে বলে গত ১৩ জুলাই ভারতের পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপা হয়। এদিকে দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রী সানোয়ার লাল জাট জানিয়েছেন, তার মন্ত্রণালয় আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী সংযোগ প্রকল্প ‘মানস-সংকোষ-তিস্তা-গঙ্গা’র কাজ শুরু করবে। এ সময় পানিসম্পদ মন্ত্রী আরো বলেছেন, এ সংযোগ প্রকল্প শুধু এ অঞ্চলের কৃষি ও পানির প্রাপ্যতাকেই সহজ করে তুলবে না; একইসঙ্গে তা দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিশাল পরিমাণ পানি সরবরাহ করবে।
উল্লেখ্য, ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটার ডেভলপমেন্ট এজেন্সি প্রায় ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩৮টি নদীসহ বিভিন্ন নদীর মধ্যে ৩০টি সংযোগ খাল স্থাপনের পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনার বিশেষ দিক হচ্ছে নদীর এক অববাহিকার উদ্বৃত্ত পানি অন্য অববাহিকায় যেখানে ঘাটতি রয়েছে সেখানে স্থানান্তর করা। এর মধ্যে ১৮টি নদী হিমালয় অঞ্চলের এবং ২০ পেনিনসুলার। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত সারাদেশে ৭৪টি জলাধার ও বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণ করবে। এর মাধ্যমে তারা আড়াই কোটি হেক্টর জমিকে সেচের আওতায় আনবে আর জলবিদ্যুত্ উত্পন্ন করবে। এরই মধ্যে তারা ১১টি সংযোগ খালের সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
এদিকে, দেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পানি আইন ও গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী উজানের দেশ ভারত আন্তঃদেশীয় নদীর পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। এমনকি যে কোন ধরনের কার্যক্রম হাতে নিতে হলেও দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে তা করতে হবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গঙ্গার পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির প্রস্তাবনার তিন নম্বর অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি ও এসব নদীতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের জনগণের সুবিধা বিবেচনা করে দেখা হবে। চুক্তির নয় নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দুই দেশের সরকার ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা ও কারো ক্ষতি করা নয়—এসব নীতিমালার আলোকে যৌথ নদীর পানি ভাগাভাগি করতে সম্মত আছে। সুতরাং এই চুক্তির আওতায় ভারত কোনভাবেই একতরফাভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না।
বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সংযোগ খালের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশ কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হবে। মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতি ও কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের শাখা নদীগুলোর পানিপ্রবাহ আশংকাজনক হারে কমে যাবে। আর জলাভূমিগুলোও শুকিয়ে যাবে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমে গেলে লবণাক্ততা দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত উঠে আসতে পারে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ইতোমধ্যেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারা এও বলছেন, ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ অংশ (যেখানে ধান ও গমের মোট উত্পাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে) পানির অভাবে নিষ্ফলা হয়ে যাবে। গঙ্গার ওপর নির্ভরশীল দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। এ সংযোগ প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়বে। যার প্রভাবে নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষি, মত্স্য, পশুসম্পদ, শিল্প-কারখানা বিপর্যস্ত হবে। পাশাপাশি আর্সেনিক দূষণ তীব্র হবে, নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে নৌচলাচল ব্যাহত হবে, ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রবাহ নেমে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন।
এ প্রসঙ্গে ওয়ারপো’র (ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন) সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী এম এ কাসেম বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী ভারত একতরফাভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না। কারণ ভাটির দেশ হিসাবে এই প্রকল্পে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে কিনা তা সমীক্ষা না চালিয়েই তারা এটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। যা দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী আইনের লংঘন।
এদিকে, ওয়ারপোর সাবেক মহাপরিচালক ম ইনামুল হক বলেন, বাংলাদেশে প্রবাহিত হয় এমন বেশ কিছু নদীতেই সংযোগ খাল স্থাপন করে পানি প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা রয়েছে এ প্রকল্পে। ইতোমধ্যেই তিস্তা থেকে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহারের সংযোগ খালের কাজও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে।
ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প
হিমালয় অববাহিকার নদীগুলোর ক্ষেত্রে যে ১৩টি সংযোগগুলোর প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হলো: ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা (তিস্তা-গঙ্গা-মানস-সংকোষ) সংযোগ, কোশি-মেচি, কোশি-ঘাঘড়া, গন্ধক-গঙ্গা, গঙ্গা-যমুনা, সারদা-যমুনা, যমুনা-পশ্চিম যমুনা খাল (রাজস্থান) খালের শীর্ষ শাখা, শবরমাটি সংযোগ পর্যন্ত রাজস্থান খালের সম্প্রসারণ, চুনার-সোন বাঁধ সংযোগ, সোন বাঁধ-গঙ্গা গঙ্গা সংযোগের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপনদী, গঙ্গা-দামোদর-সুবর্ণরেখা সংযোগ, ফারাক্কা-সুন্দরবন সংযোগ ও ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা (জেটিএফ) সংযোগ। সবক’টি সংযোগ খালই হিমালয় আববাহিকায় অবস্থিত।
১৯৮০ সালে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি জাতীয় পানি পরিকল্পনার কাজে হাত দেয়। সেই পরিকল্পনার আলোকে ২০০২ সালের ১৪ আগস্ট দেশটির তত্কালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম সংযোগ খাল তৈরি করে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোকে জুড়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। ভারত সরকার প্রকল্পের ব্যয় ধরে ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি রুপি বা ১১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ২০০৪ সালে দুই দেশের পরিবেশবাদীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন স্থগিত হয়ে পড়ে। যদিও ভারত এরই মধ্যে তার নিজস্ব নদীগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ করে ওই পরিকল্পনার কিছু কিছু অংশ বাস্তবায়ন করে চলেছে।